বিশ্বের দেড়শো কোটিরও বেশি মুসলিমের হৃদয়ের স্পন্দন, পবিত্র কাবা শরিফ। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে পৃথিবীর যে প্রান্তেই মানুষ থাকুক না কেন, বুক বেঁধে দাঁড়ান এই এক কিবলার দিকে। কিন্তু কাবার এই চিরচেনা কৃষ্ণবর্ণ রূপ, যা আমরা আজ দেখি, তার পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, শিল্পকলা এবং সংস্কৃতির এক অনুপম মেলবন্ধন। কাবার পবিত্র আবরণ বা 'কিসওয়া' (যা আমাদের অঞ্চলে গিলাফ নামে সমধিক পরিচিত)— কেবল একটি বস্ত্রখণ্ড নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর ভক্তি ও শ্রদ্ধার এক জীবন্ত প্রতীক।
ইতিহাসের পাতা থেকে কিসওয়ার বিবর্তন
অনেকেরই ধারণা, কাবার গিলাফ বোধহয় শুরু থেকেই কালো রঙের ছিল। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ইসলামের প্রাচীন যুগে এবং তারও আগে, কাবার গিলাফের রঙে ছিল বৈচিত্র্য। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ৪০০ খ্রিষ্টাব্দে ইয়েমেনের রাজা তুব্বা আস’আদ কামিল সর্বপ্রথম বিশেষ ইয়েমেনি কাপড় দিয়ে কাবা ঢেকেছিলেন। পরবর্তীতে উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে লাল, সবুজ, সাদা এবং হলুদ রঙের গিলাফও ব্যবহার করা হয়েছে। তবে আব্বাসীয় খিলাফতের সময়কাল থেকে কালো রঙটি কাবার গিলাফের জন্য একটি স্থায়ী ও অনন্য পরিচয় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
একটা সময় ছিল যখন কিসওয়া তৈরির মূল কেন্দ্র ছিল মিসর। সেখানকার রাজকীয় 'তিরাজ' কারখানায় বোনা গিলাফ প্রতিবছর জিলহজ মাসের শুরুতে এক মহাসম্মানীয় কাফেলার মাধ্যমে মক্কায় পাঠানো হতো। পরবর্তীতে দামেস্ক ও বাগদাদেও এটি তৈরি হয়েছে। তবে আধুনিক যুগে এই গৌরবময় দায়িত্ব পালন করছে সৌদি আরবের আল-সৌদ পরিবার।
সোনার সুতা আর ইতালিয়ান রেশমের মহাকাব্য
বর্তমানে কিসওয়া তৈরির প্রক্রিয়াটি আধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রাচীন ক্যালিগ্রাফি শিল্পের এক অবিশ্বাস্য সংমিশ্রণ। একটি কিসওয়া তৈরিতে খরচ হয় প্রায় আড়াই কোটি সৌদি রিয়াল (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৮১ কোটি টাকারও বেশি)।
ইতালি থেকে আনা প্রায় ৬৭০ কেজি খাঁটি প্রাকৃতিক রেশম প্রথমে অলিভ অয়েল সাবান ও বিশেষ ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে সুতার প্রাকৃতিক মোম দূর করা হয়। এরপর তা ৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার গরম পানিতে সেদ্ধ করে চওড়া কালো রঙে রূপান্তর করা হয়। এই রেশমি কাপড়ের ওপর প্রায় ১২০ কেজি ২৪ ক্যারেটের সোনার সুতা এবং ১০০ কেজি রুপার সুতা দিয়ে অত্যন্ত নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তোলা হয় পবিত্র কোরআনের আয়াত ও আল্লাহর জিকির। মক্কার বিশেষায়িত কারখানায় ২৪০ জনেরও বেশি দক্ষ কারিগর বছরজুড়ে এই পবিত্র দায়িত্ব আঞ্জাম দেন।
সুরক্ষা ও হজের চিরন্তন দৃশ্য
হজের সময় আমরা প্রায়ই টেলিভিশনের পর্দায় দেখি কাবার গিলাফের নিচের অংশটি সাদা কাপড়ে মুড়ে ওপরের দিকে তুলে রাখা হয়েছে। এটি মূলত করা হয় কিসওয়ার সুরক্ষার জন্য। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ হাজি যখন তাওয়াফ করেন, তখন আবেগ ও বরকতের আশায় গিলাফ স্পর্শ করতে চান। বিপুল জনতার চাপে কাপড়ের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেজন্যই সাময়িকভাবে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
পুরোনো গিলাফের গন্তব্য কোথায়?
বছরে একবার জিলহজ মাসে যখন কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হয়, তখন পুরোনো গিলাফটি কিন্তু ফেলে দেওয়া হয় না। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এর সোনা ও রুপার সুতাখচিত প্যানেলগুলো কেটে সংরক্ষণ করা হয়। এগুলো পরবর্তীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাদুঘর, রাষ্ট্রপ্রধান বা বিশিষ্ট সংস্থাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। আর বাকি অংশগুলো ছোট ছোট টুকরো করে বিতরণ করা হয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও বিদেশি দূতাবাসগুলোর মাঝে।
কাবা শরিফ শুধু একটি স্থাপত্য নয়, এটি কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসের বাতিঘর। আর এর গায়ে জড়ানো কিসওয়া সেই বিশ্বাসের গায়েই যেন এক রাজকীয় ও স্বর্গীয় সৌন্দর্যের চাদর।