জনপ্রতিনিধিদের কাজ যেখানে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সেখানে সরকারি সাহায্যের চাল চাইতে গিয়ে উল্টো জুতাপেটার শিকার হওয়ার এক বর্বর ও লজ্জাজনক অভিযোগ উঠেছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে ভিজিএফ কার্ডের চাল চাওয়াকে কেন্দ্র করে কহিনুর বেগম (৩৭) নামের এক অসহায় নারীকে প্রকাশ্যে জুতো দিয়ে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে এক সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে। এই অমানবিক ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে।
গত রবিবার (২৪ মে) দুপুর ২টার দিকে উপজেলার চরজুবলি ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন একটি কম্পিউটার দোকানের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে এ ঘটনা ঘটে।
অভিযুক্ত নাছিমা বেগম চরজুবলি ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য। অন্যদিকে, নির্যাতনের শিকার কহিনুর বেগম একই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের জয়নাল সর্দার বাড়ির জয়নাল আবেদীনের মেয়ে।
‘ভোটের সময় খালা-মা ডাকে, এখন চাল দেয় না’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভুক্তভোগী কহিনুর বেগম নিজের নির্মম অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, "আমার স্বামী ক্যানসার আক্রান্ত। কিছুদিন আগে আমার এক মেয়েও অসুস্থ হয়ে মারা গেছে। চরম অভাবের সংসারে ঈদের আগে গরিবদের চাল দেওয়া হচ্ছে শুনে একটি কার্ডের আশায় স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলমের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে ইউনিয়ন পরিষদে অপেক্ষা করতে বলে বাড়িতে চলে যান।"
দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও চালের স্লিপ না পেয়ে ক্ষোভে ও হতাশায় কহিনুর বেগম ইউনিয়ন পরিষদের পাশের একটি কম্পিউটার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলেন—"মঞ্জুরুল মেম্বার আমাকে একটা চালের স্লিপ দিল না। ভোট আসলে এরা বাড়ি গিয়ে খালা-মা ডাকে। ভোট আসলে এদের আর ভোট দেব না।"
কহিনুরের অভিযোগ, ওই দোকানের পেছনেই বসা ছিলেন সংরক্ষিত নারী মেম্বার নাছিমা বেগম, যাকে তিনি আগে খেয়াল করেননি। নিজের দলের মেম্বারের বিরুদ্ধে ভোটার নারীর এমন ক্ষোভ শুনেই ক্ষিপ্ত হয়ে পেছন থেকে তেড়ে আসেন নাছিমা। এরপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজের পায়ের জুতো খুলে কহিনুর বেগমকে সবার সামনে পেটাতে শুরু করেন।
অভিযোগ অস্বীকার মেম্বারের, দায় এড়ানোর চেষ্টা চেয়ারম্যানের
প্রকাশ্যে জুতাপেটা করার এই গুরুতর অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছেন ইউপি সদস্য নাছিমা বেগম। তাঁর দাবি, "ওই নারী আসলে খারাপ আচরণ করেছেন। উল্টো আমার বোরকা ধরে টানাটানি করলে আমি তাঁকে সরিয়ে দিই মাত্র। জুতাপেটার কোনো ঘটনাই ঘটেনি। আপনারা এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখেন আমি এমন কাজ করতে পারি কি না।"
এদিকে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া বা দায় এড়ানোর সুর শোনা গেছে চরজুবলী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিম খলিলের কণ্ঠে। তিনি বলেন, "ওই নারী আমার ইউনিয়নের বাসিন্দাই নয়, আমি তাঁকে চিনি না। চাল বিতরণের সময় এসে তিনি খুব গালমন্দ করছিলেন। পরে বাজারে কী যেন একটা গণ্ডগোল হয়েছে শুনেছি।"
প্রশাসনের আশ্বাস
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং এক অসহায় নারীর ওপর এমন চড়াও হওয়ার ঘটনাটি সুবর্ণচর উপজেলা প্রশাসন পর্যন্ত গড়িয়েছে। সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আকিব ওসমান বলেন, "ঘটনাটি আমরা শুনেছি। ওই নারীর পরিচয় পুরোপুরি শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। পরিচয় নিশ্চিত হয়ে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"