২৪ মে, ২০২৬

কালের গর্ভে বিলীন সাঁথিয়ার তলট জমিদারবাড়ি: অবহেলায় প্রাচীন নিত্যানন্দ মঠ ও ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ

কালের গর্ভে বিলীন সাঁথিয়ার তলট জমিদারবাড়ি: অবহেলায় প্রাচীন নিত্যানন্দ মঠ ও ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার তলট গ্রামের ঐতিহ্যবাহী দু'টি জমিদার পরিবারের গৌরবময় ইতিহাস আজ ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে তৎকালীন রাজকীয় ভবনগুলো। বর্তমানে শুধুমাত্র একটি প্রাচীন মন্দিরের মঠের ভগ্নাবশেষ এবং পুরোনো পুকুরগুলো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঐতিহাসিক রাধারমণ সাহার 'পাবনা জেলার ইতিহাস' গ্রন্থ এবং স্থানীয় অনুসন্ধানে এই জমিদারবাড়ির এক বর্ণিল ইতিহাস জানা যায়।

জমিদার গিরিধর রায় ও শশধর রায়ের বংশলতিকা
তলট গ্রামের জমিদারি প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিলেন গিরিধর রায়, যিনি রাজশাহী আদালতের মোক্তার ছিলেন। তাঁর সুযোগ্য পুত্র শশধর রায় প্রথমে রাজশাহী আদালতে এবং পরবর্তীতে কলকাতা হাইকোর্টে দীর্ঘ বছর ওকালতি করেন। ওকালতির পাশাপাশি সাহিত্যিক ও সম্পাদক হিসেবেও তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

শশধর রায়ের দুই পুত্র ও এক কন্যা ছিল। দেশভাগের প্রাক্কালে ১৯৪৬ সালে তাঁর বড় ছেলে ভবেশ রায় ভারতের মুর্শিদাবাদের বহরমপুর থানার বলরামপুর গ্রামে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর বংশধরেরা (পরেশ রায়, নরেশ রায়, রঞ্জন রায় প্রমুখ) এখনো সেখানেই আছেন। অন্যদিকে, ছোট ছেলে প্রফুল্ল রায় রাজবাড়ির পাংশায় বসতি স্থাপন করেন। শশধর রায়ের একমাত্র কন্যার বিয়ে হয়েছিল সাটিয়াকোলার জমিদার কাশিনাথ রায়ের ছেলে বীরেন রায়ের সাথে।

বিচ্ছিন্ন বংশধরদের খোঁজে: দুঃখজনকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে শশধর রায়ের এই বংশধরদের নিজেদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ নেই। বর্তমানে মুর্শিদাবাদে বসবাসরত ভবেশ রায়ের নাতি রাজকুমার রায় তাঁর হারিয়ে যাওয়া জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগের তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

জমিদার চন্দ্রনাথ রায় ও ঐতিহ্যের প্রতিযোগিতা
তলট গ্রামে চন্দ্রনাথ রায় নামে আরও একজন প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন। তাঁর পুত্র শৈলেন্দ্রনাথ রায় এলাকায় ‘ভোলাবাবু’ নামে পরিচিত ছিলেন। সে আমলে তলট এবং পার্শ্ববর্তী করমজার জমিদারদের মধ্যে পূজা, মেলা ও ধর্মীয় পার্বণ নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলত। কে কত বড় মেলা বা চড়ক পূজা ও রথযাত্রার আয়োজন করতে পারে, তা নিয়ে চলত রাজকীয় আয়োজন। চন্দ্রনাথ রায়ের সেই সময়ের বিশাল পুকুরটি এখনো টিকে থাকলেও, এর ঐতিহাসিক শানবাঁধা ঘাটটি আজ ভেঙেচুরে ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে।

বর্তমান অবস্থা: সংস্কারের অপেক্ষায় প্রাচীন নিত্যানন্দ মঠ
জমিদারবাড়ির বর্তমান বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর আলম বাচ্চু জানান, অতীতে এই বিশাল চত্বরে ১০টি চমৎকার ভবন বা বিল্ডিং ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই পুরোনো আমলের একটি ভবনও অক্ষত নেই। জমিদারবাড়ির সিংহভাগই এখন ধ্বংসস্তূপ।

একমাত্র অস্তিত্ব: পুরো জমিদারবাড়ির মধ্যে বর্তমানে কেবল প্রাচীন নিত্যানন্দ মন্দিরের মঠের কিছু অংশ কোনোমতে টিকে আছে।

বর্তমান বাসিন্দা: এই বিশাল বাড়িটিতে এখন বেশ কয়েকটি হিন্দু ও মুসলিম পরিবার যৌথভাবে বসবাস করছে।

জরুরি দাবি: স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, সাঁথিয়ার এই ঐতিহাসিক স্মৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রাচীন নিত্যানন্দ মঠের ধ্বংসাবশেষ এবং চন্দ্রনাথ রায়ের পুকুরের শানবাঁধা ঘাটটি জরুরি ভিত্তিতে সরকারি উদ্যোগে সংস্কার ও রক্ষা করা প্রয়োজন।