২৪ মে, ২০২৬

তেহরানের ‘নেপথ্য নায়ক’ ভাহিদি: ওয়াশিংটনের মাথাব্যথার নতুন কারণ

তেহরানের ‘নেপথ্য নায়ক’ ভাহিদি: ওয়াশিংটনের মাথাব্যথার নতুন কারণ

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। তবে এই মুহূর্তে তেহরানের পরবর্তী সামরিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ কী হবে, তা নির্ধারণে পর্দার আড়াল থেকে মূল ভূমিকা রাখছেন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বর্তমান প্রধান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ভাহিদি। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের সাথে যেকোনো ধরনের আপসের ঘোর বিরোধী এই কট্টরপন্থী জেনারেলের উত্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

আকস্মিক উত্থান ও কট্টর নীতির বাস্তবায়ন
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় আইআরজিসির তৎকালীন প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হওয়ার পর আকস্মিকভাবে বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে আসেন আহমাদ ভাহিদি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবেক প্রধানের তুলনায় ভাহিদি অনেক বেশি কট্টর ও ইসলামি বিপ্লবের আদর্শের প্রতি গভীরভাবে অবিচল।

ইতিমধ্যে তাঁর নেতৃত্বে আইআরজিসি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। ফলে আগের চেয়েও অনেক শক্তিশালী অবস্থানে থেকে ওয়াশিংটনের কাছে নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরছে তেহরান।

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও পরোয়ানা
জেনারেল ভাহিদি দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা বিশ্বের নজরদারিতে আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক অভিযোগ:

ইন্টারপোলের রেড নোটিশ: তিন দশক আগে, ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে ভয়াবহ বোমা হামলায় ৮৫ জন নিহতের ঘটনায় ইন্টারপোল তাঁকে খুঁজছে।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: ২০২২ সালে মাসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানে ছড়িয়ে পড়া দেশব্যাপী বিক্ষোভ নিষ্ঠুরভাবে দমনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।

এছাড়াও, আশির দশকের আলোচিত ‘ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি’র সময় ইসরায়েলিদের সঙ্গে অস্ত্রসংক্রান্ত গোপন যোগাযোগের ক্ষেত্রেও তাঁর নাম জড়িয়েছিল। তিনি আইআরজিসির অভিজাত শাখা কুদস ফোর্সের প্রথম কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

ট্রাম্পের আলটিমেটাম বনাম ভাহিদির হুঙ্কার
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক বিবৃতিতে তেহরানকে শান্তি চুক্তিতে আসার আহ্বান জানিয়েছেন, অন্যথায় কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, "হয় আমাদের মধ্যে চুক্তি হবে, নয়তো আমরা কঠোর কিছু করতে যাচ্ছি।"

তবে মার্কিন এই হুমকিকে পাত্তাই দিচ্ছেন না জেনারেল ভাহিদি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এবং বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি পাল্টা সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন:

"ইরানের মাটিতে যদি আর কোনো হামলা হয়, তবে পরিস্থিতি আর সীমিত আঞ্চলিক যুদ্ধে আটকে থাকবে না। এবার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলবে এবং সব সীমানা ছাড়িয়ে যাবে। তোমরা ধ্বংসাত্মক আঘাতের মুখোমুখি হবে।"

পর্দার আড়ালের আসল চালিকাশক্তি
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পবিষয়ক পরিচালক আলী ভায়েজ এবং ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচের মতে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জনসমক্ষে আলোচনা চালালেও, নেপথ্যের মূল নীতিনির্ধারক ভাহিদিই।

কয়েক সপ্তাহের প্রস্তাব বিনিময়ের পরও তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মূল বিষয়ে কোনো ছাড় দেয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে নেতৃত্বশূন্য করার যে চেষ্টা চালিয়েছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে। ভাহিদির মতো কট্টরপন্থীদের হাতে নেতৃত্ব চলে যাওয়ায় ইরান এখন যেকোনো পরিস্থিতিতে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, যা মার্কিন প্রশাসনের জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।