২৩ মে, ২০২৬

দুম্বার বাণিজ্যিক চাষ গুরুদাসপুরে, কোরবানির জন্য চাহিদার তুঙ্গে

দুম্বার বাণিজ্যিক চাষ গুরুদাসপুরে, কোরবানির জন্য চাহিদার তুঙ্গে

দুম্বা। মরুভূমি অঞ্চলের এই প্রাণীটির এখন বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে গুরুদাসপুরে। সটাম দেহ আর ভরপুর মাংস থাকায় কোরবানির জন্য চাহিদার তুঙ্গে ভিনদেশী এই প্রাণি। দেশীয় গরু-মহিষের চেয়ে দুম্বা বিক্রি করে লাভ বেশি হওয়ায় ৩২ বিঘার ওপর গড়ে তোলা হয়েছে খামার। 

খামারির নাম হান্নান সরকার। গুরুদাসপুর উপজেলার চাপিলা ইউনিয়নের খামারপাথুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা তিনি। ৩০ দুম্বা পালনের মাধ্যমে শুরু করার পর ভালো লাভের মুখ দেখেন তিনি। এরপর বেড়েছে খামারের পরিধি। একে একে হান্নানের খামারে এখন বিক্রয়যোগ্য ৬০টি দুম্বা। হান্নান সরকার বর্তমানে নাটোর জেলার সফল খামারি।

প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, এই অঞ্চলের মধ্যে হান্নান সরকারের একটিমাত্র দুম্বার খামার। দেশজুড়ে রয়েছে দুম্বার ক্রেতা। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দুম্বা কিনতে এই খামারে ছুটে আসছেন নানা শ্রেণির মানুষ। কোরবানি ঈদ ঘিরে বেড়েছে ক্রেতা, বেড়েছে খামার সংশ্লিষ্টদের ব্যস্ততাও। এই মওসুমে দুম্বা বিক্রি করে হান্নান সরকার বৃহৎ মুনাফা অর্জন করবেন এমন আশা তার।

যেভাবে শুরু হলো হান্নানের দুম্বা খামার
২০১০ সালের দিকে দেশীয় ছাগল পালন দিয়ে শুরু। এরপর গরু। তবে এই অঞ্চলে প্রচুর খামার থাকায় গরু-ছাগলে তেমন সম্ভাবনা খুঁজে পাননি তিনি। মাথায় আসে ব্যতিক্রম কিছু করার চিন্তা। সেই চিন্তা থেকে খামারে যুক্ত করেন মরু অঞ্চলের গারল। এই পশু পালনে আশার সঞ্চার ঘটে। গারলের সঙ্গে খামারে যুক্ত করেন দুম্বা। প্রাথমিক পর্যায়ে ভারত থেকে নারী ও পুরুষ জাতের সমন্বয়ে ৩০টি দুম্বা আনা হয়। লাভের মুখ দেখায় বাড়ানো হয় খামারের পরিধি। এখন ৩২ বিঘার বিশাল আয়তনে হান্নানের দুম্বার খামার। দুম্বার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬০টি। 

খামারি হান্নান সরকার বলেন, তার খামারে বর্তমানে ৪০টির বেশি দুম্বা কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। দুম্বার গঠন ভেদে নূণ্যতম ১ লাখ টাকা থেকে দুম্বার দাম হাকা হচ্ছে। সর্বোচ্চ দাম উঠছে ৩ লাখের বেশি। প্রতি দিনই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে খামারে ক্রেতা আসছেন দুম্বা কেনার জন্য।

তিনি বলেন, খামারটিতে যখন দুম্বা পালন শুরু করেছিলেন, তখন মানুষ নানা কটু কথাও বলেছে। তেমন সারাও মেলেনি। তবে তিনি ধৈর্য্য হারাননি। এখন বছরজুড়েই তিনি দুম্বা বিক্রি করছেন। তবে কোরবানি আসলে দুম্বার চাহিদা বেড়ে যায় বহুগুনে। আবার ভিনদেশী এই প্রাণিটিকে দেখতে ভিড় জমান উৎসুখ মানুষ। সবমিলিয়ে দুম্বা খামারে তার প্রফুল্লতার মধ্যে দিন কাটে।

হান্নানের দেওয়া তথ্য বলছে, তার দেখাদেখি অনেকেই দুম্বা পালনের চেষ্টা করছেন। হান্নানের খামার থেকে দুম্বা নিয়ে স্বল্প পরিসরে খামার গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। গত কোরবানিতে অন্তত ৪০টি দুম্বা বিক্রি করে বিপুল অর্থ লাভ করেন তিনি। এবছর দুম্বা ক্রয়ে ক্রেতাদের ব্যপক চাহিদা রয়েছে। গত বছরের তুলনায় দুম্বা বিক্রিতে গত বছরের রেকর্ড্যা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন খামারি হান্নান। 

দুম্বার জন্য নিরাপদ খাবার
হান্নান সরকারের খামারের দুম্বাগুলো নিয়োমিত পরিচর্যা করেন অন্তত ২৩ জন কর্মচারী। খামারের দুম্বার খাবার যোগান দেওয়ার জন্য তিনি নিজেই প্রায় ৭ বিঘা জমিতে ঘাস চাষ করেছেন। জমির তাজা খাস কেটে খাওয়ানো হয়। পাশপাশি প্রতিদিন দুই বেলা খড় ও ভূষি খায়ানো হয়। প্রকৃতিক খাবার খাওয়ানোয় দুম্বা ভেতর থেকে শক্তিশালী হয়, মাংসও হয় সুস্বাদু।

খামারের পুরোনো শ্রমিক শফিকুল ইসলাম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, দুম্বার খামারে কাজ করা বেশ আনন্দের। প্রায় সবসময়ই ক্রেতা অথবা দর্শনার্থী থাকে। তিনি একদশক ধরে হান্নানের দুম্বার খামারে দুম্বা পরিচর্যায় নিয়োজিত আছেন। ঈদের কারণে এখন ব্যস্ততা বেড়েছে। পশুগুলোকে রোগমুক্ত রাখতে বাড়তি যত্ন নিচ্ছেন তারা।

নাটোর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম উদ্দীন বলেন, দুম্বা মূলত গ্রীষ্মপ্রধান ও শুষ্ক অঞ্চলের প্রাণী। তবে এটি বাংলাদেশের সহনশীল আবহাওয়াতেও বেড়ে উঠছে। বিশেষ করে রোদের তাপমাত্রা বেড়ায় দুম্বা আরো সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, স্থানীয় প্রাণি সম্পদ অফিসের মাধ্যমে গুরুদাসপুরে বাণিজ্যিক দুম্বা খামারে সার্বক্ষণিক নানা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কোরবানিকে ঘিরে এই খামারের দুম্বার চাহিদা রয়েছে দেশজুড়ে।