বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশু ও নারীদের ওপর জেন্ডারভিত্তিক ও যৌন সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। বিশেষ করে যেসব জায়গায় শিশুদের সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা, সেখানেই তারা নির্মম নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
গতকাল শুক্রবার (২২ মে ২০২৬) দেওয়া এক বিবৃতিতে বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, “শিশুদের ওপর এই বর্বরতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে!”
বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান চান রানা ফ্লাওয়ার্স
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই দেশে নারী ও শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের খবর যেভাবে বাড়ছে, তা অত্যন্ত স্তম্ভিত করার মতো। এই পরিস্থিতি দেশব্যাপী শিশু সুরক্ষা এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (জিবিভি) প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদার করার জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার যে সংস্কৃতি সমাজে তৈরি হয়েছে, তার অবসান ঘটাতে হবে। সেই সঙ্গে আইনের প্রয়োগ, অভিযোগ দায়ের প্রক্রিয়া, প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা, শিশুবান্ধব পুলিশিং ও বিচারব্যবস্থার সমস্ত ঘাটতি দ্রুত দূর করতে হবে।
জবাবদিহিতা ও মানসিক সহায়তার তাগিদ
কেবল আইনি সংস্কারই নয়, ইউনিসেফ সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়:
স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্র, পাড়া-মহল্লা ও শিশুযত্ন কেন্দ্রগুলোতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত মানসিক ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
ছবি-ভিডিও শেয়ার করা ‘নতুন নির্যাতন’
সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমের অপব্যবহার নিয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছে সংস্থাটি। ইউনিসেফ জানায়, ভুক্তভোগী শিশু বা নারীর ছবি, ভিডিও কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা এক ধরনের "পুনর্নির্যাতন"। যারা না বুঝে বা সস্তা প্রচারের জন্য এগুলো শেয়ার ও রি-শেয়ার করছেন, তারা মূলত ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের মানসিক ট্রমা এবং সামাজিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
তাই সাধারণ জনগণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীদের ছবি শেয়ার না করে বরং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে এবং মানুষের নিরাপত্তা জোরদার করার দাবিতে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
নীরবতা ভাঙার আহ্বান: চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮
“সমাজে নীরবতা বজায় থাকলে সহিংসতা আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।”
কোনো ধরনের নির্যাতন বা শোষণের ঘটনা ঘটলে তা চেপে না রেখে তাৎক্ষণিকভাবে শিশু হেল্পলাইন ১০৯৮-এ যোগাযোগ করার অনুরোধ করেছে ইউনিসেফ। এই হেল্পলাইনটি ভুক্তভোগী শিশুদের তাৎক্ষণিক উদ্ধার, আইনি ও মানসিক সহায়তা দিতে সার্বক্ষণিক কাজ করে।
বিবৃতির শেষে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, প্রতিটি শিশুরই সমাজ, বিদ্যালয়, ঘর—এমনকি গণমাধ্যমে তাদের গল্প বা ছবি উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও সুরক্ষিত থাকার এবং মর্যাদা পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।