ঝিনাইদহে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ছাত্রদল-যুবদলের বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও বারুদঠাসা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। হামলার ঘটনায় জড়িতদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম দিয়ে তিনি ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “যদি গ্রেপ্তার না করা হয়, আপনারা যদি ভায়োলেন্স (সহিংসতা) বেছে নেন, তাহলে আমাদেরকেও ভায়োলেন্স বেছে নিতে বাধ্য হতে হবে।”
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাবেক এই উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের উদ্যোগে গঠিত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইউনাইটেড পিপল’স বাংলাদেশ’ (আপ বাংলাদেশ)-এর ঢাকার দুই মহানগরের ২২৯ জন নেতা-কর্মীর এনসিপিতে আনুষ্ঠানিক যোগদান উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
লড়াইটা হবে পুরো প্রজন্মের সঙ্গে
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, “সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে, কিন্তু তারা প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে মোকাবিলার একধরনের কৌশল নিচ্ছে। এটা বাংলাদেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না।”
জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে বিরোধী দল বারবার সরকারকে গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের আহ্বান জানাচ্ছে উল্লেখ করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক দল এনসিপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, “বিরোধী দল থেকে বারবার সদিচ্ছা দেখানো হলেও সরকারি দল ভায়োলেন্স চাচ্ছে। আমাদের রক্ত গরম এবং বয়স কম হলেও আমরা বুঝি যে কখন কী করতে হবে, কখন দেশ গড়ার দিকে কাজ করতে হবে। কিন্তু যদি সরকারি দল ভায়োলেন্স চায়, সেটাকেই একমাত্র রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নিতে চায়, তাহলে এটা যে আমাদের থেকে বেশি কেউ পারবে না, সেটা ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি।”
সংঘাতের বিষয়ে সরকারকে কঠোরভাবে সতর্ক করে আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, “আমাদের সঙ্গে যদি এটা করতে চান, এই লড়াইটা কোনো রাজনৈতিক দল, নির্দিষ্ট মতাদর্শ বা আদর্শের সঙ্গে হবে না; এই লড়াইটা হবে পুরো একটা প্রজন্মের সঙ্গে। এই প্রজন্মের সঙ্গে লড়াই করার ভুলটা শেখ হাসিনা করেছিলেন। আশা করি, এই ভুলটা তারেক রহমান করবেন না। ভিডিও ফুটেজ ও ছবিতে হামলাকারীদের সবার পরিচয় এসেছে। আজ রাতের মধ্যে তাঁদের সবাইকে অবশ্যই গ্রেপ্তার করতে হবে।”
নিরাপত্তা সংকট ও ব্যর্থতার অভিযোগ
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে আসা আসিফ মাহমুদ বর্তমান বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র পরিচালনায় চরম ব্যর্থতার অভিযোগ তোলেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তীব্র অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “নির্বাচনের পর থেকে খুন, ধর্ষণ ও নাগরিকের নিরাপত্তার সংকট চরমভাবে বেড়েছে। আজ আমাদের মা-বোনেরা ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি যোগ করেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মাঝেমধ্যে প্রধানমন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রপতি বলে মনে হয়। তিনি তাঁর দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছেন না কিংবা করতে তাঁর মধ্যে একধরনের অনীহা দেখা যাচ্ছে। এভাবে দেশ চলতে থাকলে বাংলাদেশের জনগণ সামনের দিনে বাধ্য হবে এই সরকার ও ব্যর্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসতে।”
ছাত্রলীগ-যুবলীগের মতো দমনের চেষ্টা করলে খারাপ পতন
অনুষ্ঠানের আরেক বিশেষ অতিথি এবং এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, ঝিনাইদহের সহযোদ্ধাদের সঙ্গে জুমার নামাজের পর নাসীরুদ্দীনের পূর্বঘোষিত মতবিনিময় সভায় ছাত্রদল-যুবদলের নেতা-কর্মীরা সন্ত্রাসী কায়দায় আক্রমণ চালান। যেখানে জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদলের আহ্বায়কেরা সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। কিছুদিন আগে শাহবাগ থানার ভেতরে ঢুকে সাংবাদিকদের পেটানোর ঘটনারও এখন পর্যন্ত কোনো বিচার হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা এবং সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সহমর্মিতা জানানো প্রসঙ্গে সারজিস আলম বলেন, “সহমর্মিতার জন্য ধন্যবাদ জানাই, কিন্তু এই সহমর্মিতা যদি শুধু এক দিনের ইস্যু ধামাচাপা দেওয়ার খেলা হয়, পরের ছয় মাসেও বিচারের কোনো দিশা খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে এই সহমর্মিতার কার্ড আগামীর বাংলাদেশের জনগণ আর মেনে নেবে না।”
বিএনপি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে সারজিস আলম স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আপনার ছাত্রদল-যুবদলের নেতা-কর্মীরা অভ্যুত্থানে আমাদের সহযোদ্ধা ছিলেন। তাঁদের প্রতি আমরা শ্রদ্ধা-সম্মান দেখাতে চাই। কিন্তু তাঁরা যদি আগের ছাত্রলীগ-যুবলীগের মতো সন্ত্রাসী কায়দায় রাজনৈতিক আন্দোলনকে দমন করার চেষ্টা করেন, তাহলে তার চেয়ে খারাপভাবে তাদের পতন হবে, ইনশা আল্লাহ। আগামীর বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পেটোয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করে অন্য কোনো দলমতের ওপর দমন-পীড়ন আর মেনে নেওয়া হবে না।”
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভাটি সঞ্চালনা করেন যুগ্ম সদস্যসচিব শাহরিন সুলতানা। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।