২২ মে, ২০২৬

ফিফার ‘মেগা’ বিশ্বকাপের আড়ালে পরিবেশ বিপর্যয়ের মহোৎসব

ফিফার ‘মেগা’ বিশ্বকাপের আড়ালে পরিবেশ বিপর্যয়ের মহোৎসব

ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, জমকালো এবং লাভজনক বিশ্বকাপ আয়োজনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বিশ্ব ফুটবল। আগামী ১১ জুন থেকে আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আঙিনায় গড়াতে যাচ্ছে ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ। তবে এই বিশ্বমঞ্চের আলোর ঠিক নিচেই জমাট বাঁধছে এক গাঢ় অন্ধকার। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে এবারের আসরটি নাম লেখাতে যাচ্ছে ক্রীড়া ইতিহাসের ‘সর্বোচ্চ পরিবেশদূষণকারী’ ইভেন্ট হিসেবে।

সুইজারল্যান্ডের লুজান বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউনিল) ভূগোলবিদ ডেভিড গগিশভিলি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপি-কে স্পষ্ট জানিয়েছেন, যেখানে অলিম্পিক গেমসের বিগত আসরগুলোতে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনা হচ্ছে, সেখানে ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা ফিফা হাঁটছে সম্পূর্ণ উল্টো পথে।

পরিসংখ্যানের ভয়াবহ রূপ

ইউনিলের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে ফিফার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ জমা হলেও, এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে রেখে যাবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘কার্বন ফুটপ্রিন্ট’। এবারের আসরে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৫০ থেকে ৯০ লাখ টন!

বিগত মেগা ইভেন্টগুলোর সাথে তুলনা করলে এই ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

২০২৪ প্যারিস অলিম্পিক: কার্বন নিঃসরণ ছিল প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার টন।

২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ: কার্বন নিঃসরণ ছিল ২১ লাখ ৭০ হাজার টন (ম্যাচ সংখ্যা ছিল এবারের চেয়ে ৪০টি কম)।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপ: শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়ামের তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও নিঃসরণ ছিল ৩১ লাখ ৩০ হাজার টন।

ভয়াবহতার মাত্রা বোঝাতে যুক্তরাজ্যের ‘সায়েন্টিস্টস ফর গ্লোবাল রেসপন্সিবিলিটি’র গবেষকরা একটি সমীকরণ দিয়েছেন। তাদের মতে, এবারের বিশ্বকাপের মাত্র একটি একক ম্যাচ থেকেই ৪৪ হাজার থেকে ৭২ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসৃত হবে—যা পুরো এক বছরে যুক্তরাজ্যের প্রায় অর্ধলক্ষ গাড়ির মোট কার্বন নিঃসরণের সমান!

দূরত্ব এবং বিমানের অন্তহীন চাকা

বিশ্বকাপের পরিধি বাড়াতে গিয়ে এবার দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৮। আর ভেন্যু নির্বাচন করা হয়েছে উত্তর আমেরিকার বিশাল মহাদেশ জুড়ে। ১৬টি ভেন্যুর অবকাঠামো আগে থেকে প্রস্তুত থাকলেও মূল সংকট তৈরি করেছে এদের মধ্যকার ভৌগোলিক দূরত্ব।

উদাহরণস্বরূপ, মায়ামি থেকে ভ্যাঙ্কুভারের দূরত্ব ৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি। গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলতেই বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে টরন্টো থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস হয়ে সিয়াটলে পাড়ি দিতে হবে ৫ হাজার ৪০ কিলোমিটার। ফিফার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রায় ৫০ লাখের বেশি সমর্থক, খেলোয়াড় ও অফিশিয়ালদের এই বিশাল দূরত্ব পাড়ি দিতে বারবার চড়তে হবে আকাশে। ফলস্বরূপ, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান খলনায়ক—আকাশপথের কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পাবে বহুগুণ।

ফিফার ‘গ্রিনওয়াশিং’ ও উদাসীনতা

গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত কপ২৬ জলবায়ু সম্মেলনে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ফাঁকা বুলি আওড়ালেও, বাস্তবে তার প্রতিফলন শূন্য। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপকে ‘কার্বন-নিরপেক্ষ’ দাবি করায় ২০২৩ সালের জুনে সুইস ফেয়ারনেস কমিশন (সিএসএল) ফিফাকে মিথ্যা প্রচার বা ‘গ্রিনওয়াশিং’-এর দায়ে কঠোরভাবে তিরস্কার করে। সম্ভবত সেই কারণেই ২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে পরিবেশ সুরক্ষার কোনো গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা দেওয়ার সাহস দেখায়নি ফুটবলের এই সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘নিউ ওয়েদার ইনস্টিটিউট’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, যেকোনো আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচের জলবায়ুগত ব্যয় জাতীয় পর্যায়ের একটি শীর্ষ ম্যাচের চেয়ে ২৬ থেকে ৪২ গুণ বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষতি কমানোর একমাত্র উপায় ইভেন্টের পরিধি ও খেলোয়াড়ের সংখ্যা সীমিত করা, যা অলিম্পিক কমিটি করে দেখিয়েছে। কিন্তু ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ (৩২ দল) ও ছেলেদের বিশ্বকাপ (৪৮ দল) উভয়েরই আকার বাড়িয়ে চলেছে।

ভবিষ্যৎ আরও আশঙ্কাজনক

আইক্স-মার্সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গিলস পাচে ২০২৪ সালের এক গবেষণা পত্রে লিখেছেন, “পরিবেশের প্রশ্নে ফিফার উদাসীনতা ও অস্বীকৃতি চলতেই থাকবে।” তার এই কথার সত্যতা মেলে ফিফার আগামী দিনের পরিকল্পনাগুলোতে।

২০৩০ বিশ্বকাপ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ৩টি মহাদেশের ৬টি দেশে (আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, মরক্কো, স্পেন ও পর্তুগাল)। অর্থাৎ, বিমান ভ্রমণের পরিমাণ বাড়বে জ্যামিতিক হারে। আর ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক হতে যাচ্ছে সৌদি আরব, যেখানে কাতারের মতোই কৃত্রিম উপায়ে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য বিপুল শক্তির অপচয় হবে। উল্টোদিকে, বিশ্বের বৃহত্তম তেল উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান ‘আরামকো’ এখন ফিফার প্রধান স্পনসর।

সব মিলিয়ে, মাঠের ফুটবল যত জমজমাটই হোক না কেন, সবুজ পৃথিবীর বুক চিরে ফিফার এই ‘বাণিজ্যিক ক্ষুধা’র মহোৎসব আগামী দিনে মানবজাতিকে এক চরম জলবায়ু বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে—তা বলাই বাহুল্য।