কক্সবাজারের ফুসফুস খ্যাত প্রাকৃতিক বনভূমি এখন অস্তিত্ব সংকটে। নির্বিচার গাছ কাটা, ভূমি দখল আর অপরিকল্পিত উন্নয়নের করাল গ্রাসে বন থেকে আশঙ্কাজনক হারে হারিয়ে যাচ্ছে ‘মা গাছ’ বা ‘ফরেস্ট সিড ট্রি’। সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) সহায়তায় এবং বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (CNRS) পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। কক্সবাজার সদর, উখিয়া, রামু ও টেকনাফ উপজেলার বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে এখন মাত্র ৫০০টি মা গাছ টিকে আছে।
গবেষকেরা বলছেন, মা গাছ কমে যাওয়ার অর্থ হলো পুরো বন অভিভাবকহীন হয়ে পড়া। এতে প্রাণ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে এবং বনের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) ভেঙে পড়ছে। আজ আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবসে কক্সবাজারের বনের এই বিপন্ন দশা পরিবেশবাদীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
বনের ভরকেন্দ্র ‘মা গাছ’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক এবং চার দশকের অভিজ্ঞ গবেষক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন জানান, প্রতি হেক্টরে অন্তত ৮ থেকে ১০টি মা গাছ থাকা বাঞ্ছনীয়। মা গাছের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
উন্নত বংশগতি ও গঠন: এই গাছগুলোর জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকে চমৎকার এবং এগুলো প্রচুর পরিমাণে সবল বীজ উৎপাদনে সক্ষম।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গাছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্থানান্তরের জন্য মা গাছকে সম্পূর্ণ রোগবালাই ও পোকামাকড়মুক্ত হতে হয়।
বনের বিস্তার: মা গাছ বনের ‘ভরকেন্দ্র’ হিসেবে কাজ করে। এর থেকে বীজ ছড়িয়েই পুরো বনে প্রাকৃতিকভাবে নতুন উদ্ভিদের জন্ম হয় এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় গড়ে ওঠে।
শতবর্ষী প্রাচীন এসব গাছ অত্যন্ত সুউচ্চ ও সোজা গড়নের হওয়ায় এবং এর বাজারমূল্য বেশি থাকায় এগুলো বরাবরই কাঠ পাচারকারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। ফলে বন থেকে এগুলো দ্রুত উধাও হয়ে যাচ্ছে।
জরিপের খুঁটিনাটি: কোন গাছ কতটি?
২০২৪ সালে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের পর গত ডিসেম্বরে CNRS এই গবেষণা প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করে। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ৪৪,১৭৪ হেক্টর বনাঞ্চল ও এর আশপাশে মাত্র ২০টি প্রজাতির ৫০০টি মা গাছ শনাক্ত করা গেছে।
| প্রজাতির নাম | প্রাপ্ত সংখ্যা | বর্তমান অবস্থা / অবস্থান |
| কেলি কদম | ৮৮টি | জরিপে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। |
| নালি জাম ও ডেউয়া | ৭৪টি | যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। |
| মাসজুত | ৬৬টি | তৃতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যায় টিকে আছে। |
| বৈলাম | ১১টি | একসময়ের চেনা এই গাছটি এখন বিলুপ্তির মুখে। |
উচ্চতার তারতম্য: জরিপে সবচেয়ে উঁচু মা গাছটি পাওয়া গেছে রামুতে, যার উচ্চতা ৮৫.৬ মিটার (২৮১ ফুট)। অন্যদিকে সর্বনিম্ন ৫.২ মিটার উচ্চতার গাছটি মিলেছে উখিয়ায়। সবচেয়ে বেশি মা গাছ টিকে আছে উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে।
বন ধ্বংসের নেপথ্যে মানবসৃষ্ট কারণ
গবেষণা অনুযায়ী, মা গাছ কমে যাওয়ার পেছনে প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে মানুষের অবহেলাই বেশি দায়ী। অতিরিক্ত কাঠ আহরণ, দুর্বল প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের বন কেটে সবজি ও ফলের বাগান তৈরি করার প্রবণতায় বনের প্রাকৃতিক বাসস্থান সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট (IUCN) ২০২৪ সালে কক্সবাজারের ৪টি প্রজাতিকে কম ঝুঁকির (Low risk) তালিকায় রাখলেও বাস্তবে বনের মাঠে এগুলো এখন ‘অতি বিরল’। স্থানীয় নার্সারি মালিকদের মতে, বন থেকে এখন দেশীয় প্রজাতির বীজ সংগ্রহ করা অসম্ভবের কাছাকাছি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবারের আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘স্থানীয় উদ্যোগ, বৈশ্বিক প্রভাব’। গবেষকদের মতে, বনের এই মৃতপ্রায় দশা থেকে মুক্তি পেতে টিকে থাকা ৫০০টি মা গাছকে কড়া নজরদারিতে রক্ষা করতে হবে। এগুলো থেকে বীজ সংগ্রহ করে নার্সারিতে চারা তৈরি এবং বনায়ন করার মাধ্যমেই কেবল কক্সবাজারের হারিয়ে যাওয়া সবুজ ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।