জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ কার্যত দেশের রাজনীতিতে ‘ব্যাক করেছে’ বা ফিরে এসেছে—সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের এমন একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই পোস্টের পর যেমন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের একাংশের বিরুদ্ধে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ সামনে এসেছে, তেমনি মাহফুজের নিজের অবস্থান ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
যে প্রেক্ষাপটে মাহফুজের পোস্ট
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘প্রত্যাবর্তন ২.০’ বা দ্বিতীয় দফায় ফিরে আসার বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বেশ সরব হয়েছেন। একই সাথে ভারতের কিছু গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারও প্রকাশিত হয়েছে।
ঠিক এই আবহেই তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করেন যে, শেখ হাসিনার প্রতি ইনসাফ করা হবে এবং তিনি দেশে ফিরলে কোনো বিচারবহির্ভূত (এক্সট্রা জুডিশিয়াল) কিছু করা হবে না। এই সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন এক ধরনের নতুন হাওয়া বইছে, তখনই গত মঙ্গলবার রাতে মাহফুজ আলমের এই বিস্ফোরক ফেসবুক পোস্টটি আসে।
পোস্টে মাহফুজ লেখেন, “লীগ রাজনৈতিক দলের আগে একটা ধর্মতত্ত্ব, সে ধর্মতত্ত্বে ইমান আবার ফেরত এসেছে। কীভাবে ফিরল, সে গল্পই বলব আজ।” এরপর তিনি আওয়ামী লীগের ফিরে আসার পেছনে এক দীর্ঘ তালিকা ও যুক্তি তুলে ধরেন। পোস্টটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয় এবং হাজার হাজার মানুষের প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যে মুখর হয়ে ওঠে।
সহযোদ্ধা ও কুশীলবদের তীব্র প্রতিক্রিয়া
মাহফুজ আলমের এই পোস্টের নিচে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা নানা তীর্যক মন্তব্য ও প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন:
অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার মন্তব্য করেন, “উপদেষ্টাদের কারও কারও অর্থ কেলেঙ্কারির বিষয়টা মিস গেছে ভাই। ওইটা যদি একটু অ্যাড করতেন।”
সরকারে থাকার দ্বিমুখী নীতি: গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য মাহতাব উদ্দীন আহমেদ সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, মাহফুজ যখন নিজেই এই অন্তর্বর্তী সরকারের অংশ ছিলেন, তখন কেন তিনি ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করেননি? এখন সমালোচনা করায় তিনি নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন।
মুজিববাদ ও ট্যাগিং বিতর্ক: নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের নূমান আহমাদ চৌধুরীর মন্তব্যের জবাবে মাহফুজ পাল্টা দাবি করেন যে, ‘মুজিববাদী বাম’ অর্থাৎ বাকশালী বাম এবং কট্টর ডানপন্থীদের মিতালিতেই আওয়ামী লীগ আবার ফিরে আসছে।
অন্যান্য প্রসঙ্গ: ইমি নামের এক নেত্রী মন্তব্য করেন যে, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ভাঙতে যাওয়া এবং গোপালগঞ্জে এনসিপির কারণে ৫ খুনের ঘটনার দিনই মূলত ‘লীগ ব্যাক করেছে’।
ভিন্নমত অন্য সংষ্কারবাদী ও উপদেষ্টাদের
আওয়ামী লীগের এই ফিরে আসা প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল ফেসবুকে লিখেছেন, “আওয়ামী লীগ ব্যাক করেনি, তারা ছিলই। ব্যাক করেছে তাদের দম্ভ, মিথ্যাচার আর মানুষকে বিভ্রান্ত করার দুঃসাহস।” অন্যদিকে সাবেক সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ফিরোজ আহমেদ মনে করেন, লীগ সরাসরি ফেরত না এলেও যে পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে মানুষ রক্ত দিয়েছিল, জুলাইয়ের কুশীলবদের দাবার ঘুঁটি বানিয়ে সেই পুরোনো চক্রান্তই আবার ফেরত এসেছে।
মধ্যরাতে মাহফুজ আলমের দ্বিতীয় ব্যাখ্যা
পোস্টটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হলে মঙ্গলবার মধ্যরাতেই আরেকটি পোস্টের মাধ্যমে নিজের অবস্থানের ব্যাখ্যা দেন মাহফুজ আলম। (উল্লেখ্য, মাহফুজ বর্তমানে ‘অলটারনেটিভস’ নামের একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গোছানোর কাজে নিয়োজিত আছেন)।
দ্বিতীয় পোস্টে তিনি মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং আগামী দিনের করণীয় তুলে ধরে বলেন:
১. অধিকার রক্ষা: দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিকের মানবাধিকার রক্ষা এবং সংখ্যালঘু ও মাজারপন্থীদের ওপর হামলার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
২. গণহত্যার বিচার: জুলাই গণহত্যার বিচারকে মূল অগ্রাধিকার দিয়ে বিচার প্রক্রিয়ায় যেন মানবাধিকার লঙ্ঘন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
৩. উগ্রবাদ দমন: হঠকারী, উগ্রবাদী এবং অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতিকে পরাস্ত করতে হবে।
৪. ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ: গত দেড় বছরকে যারা বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের চেয়েও খারাপ দেখানোর চেষ্টা করে শেখ হাসিনার অপকর্ম ভুলিয়ে দিতে চায়, সেই ফ্যাসিস্টদের প্রতিহত করতে হবে।
৫. অর্থনৈতিক সংষ্কার: দেশের কৃষক-শ্রমিক, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জীবন-জীবিকার সংকট দূর করতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে।
সব মিলিয়ে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকারের ভেতরের ও বাইরের টানাপোড়েন এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের গুঞ্জন—সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।