১৯ মে, ২০২৬

মাথা উঁচু করেই দেশে ফিরব': ভারতে বসে হুঙ্কার শেখ হাসিনার

মাথা উঁচু করেই দেশে ফিরব': ভারতে বসে হুঙ্কার শেখ হাসিনার

বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম নিজের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মুখ খুললেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম আনন্দবাজার-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, খুব দ্রুতই তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন এবং তা হবে মাথা উঁচু করে, দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের গৌরব নিয়ে।

একই সাথে তাঁর দল আওয়ামী লীগকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার যেকোনো চেষ্টাকে 'অস্থায়ী' আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, "আওয়ামী লীগ মানুষের আবেগে রয়েছে। ফলে আমাদের ফিরে আসা অনিবার্য, এটা শুধু সময়ের ব্যাপার।"

'১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হলেও সৃষ্টিকর্তা বাঁচিয়ে রেখেছেন'
১৯৮১ সালের ১৭ মে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে বাংলাদেশে ফিরেছিলেন শেখ হাসিনা। দীর্ঘ ৪৫ বছর পর আবারও ভারতে আশ্রিত অবস্থায় সেই স্মৃতি হাতড়ে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, "আমাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমার দলকে ধ্বংস করার চক্রান্ত হয়েছিল, কিন্তু থামানো যায়নি। সৃষ্টিকর্তা যেহেতু বাঁচিয়ে রেখেছেন, আমি দ্রুতই বাংলাদেশের মাটিতে ফিরব।"

নিষেধাজ্ঞা ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ
বর্তমান বিএনপি সরকার ও বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগের ওপর আসা নানামুখী চাপ এবং দল নিষিদ্ধের গুঞ্জন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা ইতিহাসের পাতা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, "বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পরও তৎকালীন শাসকরা আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, কিন্তু দল আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরেছে। যারা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ভাবছেন, তাদের বলব ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখতে।"

সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, দল বর্তমানে নীরবে আরও শক্তিশালী ও সংগঠিত হয়ে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশে থাকা ছাত্রলীগ ও দলীয় কর্মীরা এখনো কৃষকদের পাশে এবং সরকারের 'অপশাসনের' বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নেতা-কর্মীদের দেশত্যাগ ও আইনি অধিকার নিয়ে অভিযোগ
দলের বহু সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য বর্তমানে কলকাতায় অবস্থান করছেন—এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, কেউ স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়েননি। বাংলাদেশে ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে তারা প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, "৬০০-র বেশি নেতা-কর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং দেড় লাখের বেশি কর্মীকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে।" কারাবন্দিদের ন্যূনতম আইনি অধিকার দেওয়া হচ্ছে না দাবি করে তিনি বলেন, বিদেশে থাকা কর্মীরা বর্তমানে বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরছেন। পরিবেশ অনুকূলে এলেই তারা সবাই দেশে ফিরবেন।

ভারত-তোষণের অভিযোগ নিয়ে কড়া জবাব
দীর্ঘদিন ধরে বিরোধীদের করা 'ভারত-তোষণ' বা 'দেশ বিক্রির' অভিযোগকে সরাসরি 'মিথ্যাচার' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তাঁর যুক্তি, "বর্তমান বিএনপি সরকার বা আগের অন্তর্বর্তী সরকার এখনো একটিও দেশবিরোধী চুক্তি সামনে হাজির করতে পারেনি।"

নিজের শাসনামলে ভারতের কাছ থেকে আদায় করা বিভিন্ন অর্জনের খতিয়ান তুলে ধরে তিনি বলেন:

১৯৯৬ সাল: ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি চুক্তি সম্পাদন।

২০১৪ সাল: আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে ভারতের কাছ থেকে প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা বাংলাদেশের মানচিত্রে যুক্ত করা।

২০১৫ সাল: ঐতিহাসিক স্থলসীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধান।

মৈত্রী পাইপলাইন: বর্তমান জ্বালানি সংকটে যা বাংলাদেশের জন্য 'লাইফ লাইন' হিসেবে কাজ করছে।

সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগের বিদেশনীতি সবসময় দেশের মানুষের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে, কোনো দেশের 'তাঁবেদারি' নয়।

তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা