ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মাঝেই নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি। এবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে’ এক ভয়াবহ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার পর পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেনারেটরে আগুন, তবে অক্ষত রিঅ্যাক্টর
আবুধাবির আল-ধাফরা অঞ্চলে অবস্থিত আরব উপদ্বীপের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানার ভেতরে আজ রোববার একটি ড্রোন আঘাত হানে। আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ড্রোনটির আঘাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি বহিরাগত জেনারেটরে তাৎক্ষণিক আগুন ধরে যায়। তবে সৌভাগ্যবশত কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং ওই এলাকার তেজস্ক্রিয়ার মাত্রাও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।
আমিরাতের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে আশ্বস্ত করে জানিয়েছে,
"হামলায় পারমাণবিক কেন্দ্রের মূল কার্যক্রম ব্যাহত হয়নি। সব কটি ইউনিট বর্তমানে স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে।"
আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে তৃতীয় ড্রোনের আঘাত
আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ‘পশ্চিম সীমান্ত’ থেকে ধেয়ে আসা দুটি ড্রোন মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে দেয়। তবে দুর্ভাগ্যবশত, তৃতীয় একটি ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে বারাকাহ কেন্দ্রের সীমানায় আঘাত হানতে সক্ষম হয়। ড্রোনগুলো ঠিক কোন দেশ থেকে উড্ডয়ন করেছিল, তা নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যেই উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পক্ষ এই হামলার দায় স্বীকার করেনি।
আন্তর্জাতিক মহলে ‘গভীর উদ্বেগ’
হামলার পরপরই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন,
"পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে—এমন যেকোনো সামরিক কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।"
IAEA জানিয়েছে, এই হামলার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি রিঅ্যাক্টরকে সাময়িকভাবে জরুরি ব্যাকআপ হিসেবে ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
নেপথ্যে কি ইরান-ইসরায়েল ছায়া যুদ্ধ?
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলার পর থেকেই আমিরাত এক প্রকার ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘গোপন আমিরাত সফর’ এবং আমিরাতের মাটিতে ইসরায়েলি ‘আয়রন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের খবর ইরানকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
যদিও আমিরাত সরকার ইসরায়েলের সাথে অতিরিক্ত মাখামাখির অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবে গত শুক্রবার তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক কড়া বিবৃতিতে জানিয়েছে—নিজেদের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যেকোনো বহিঃশত্রুর হুমকির জবাব দেওয়ার পূর্ণ অধিকার আমিরাতের রয়েছে।
সৌদি আরব সীমান্তের কাছে অবস্থিত এই বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি আমিরাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ পূরণ করে। ফলে, এই স্থাপনাটিতে যেকোনো বড় ধরনের বিপর্যয় পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয়কর হতে পারত। এই ড্রোন হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কতদিন টিকে থাকে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।