বিদ্যুতের দাম সরাসরি বাড়ানোর পাশাপাশি এবার ‘ধাপ’ বা স্ল্যাব পরিবর্তনের এক অভিনব কৌশল নিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে কেবল দাম বাড়ার কারণেই নয়, বরং গণনার পদ্ধতি বদলে যাওয়ার কারণেও বড় অঙ্কের বাড়তি বিল গুনতে হবে দেশের প্রায় ৩৫ শতাংশ গ্রাহককে। বিশেষ করে যারা মাসে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, সেই বিশাল নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি পড়বে চরম আর্থিক চাপে।
‘স্ল্যাব’ সুবিধার অবসান
বর্তমানে বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রে গ্রাহকরা ধাপে ধাপে সুবিধা পান। যেমন—একজন গ্রাহক ২০০ ইউনিট ব্যবহার করলে প্রথম ৭৫ ইউনিটের দাম দেন কম হারে এবং পরের ১২৫ ইউনিটের দাম দেন দ্বিতীয় ধাপের হারে। কিন্তু পিডিবির নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কোনো গ্রাহক যদি ৭৫ ইউনিটের সীমা অতিক্রম করেন, তবে তিনি আর প্রথম ধাপের সস্তা বিদ্যুতের সুবিধা পাবেন না। তখন তার পুরো ২০০ ইউনিটের বিলই হিসাব করা হবে উচ্চতর বা দ্বিতীয় ধাপের দরে।
এক নজরে বিলের পার্থক্য (২০০ ইউনিটের জন্য):
বর্তমান বিল: ১,২৯৪.৫০ টাকা।
শুধু ধাপ বদলালে বিল: ১,৪৪০.০০ টাকা।
দাম ও ধাপ দুই-ই বদলালে প্রস্তাবিত বিল: ১,৬৪০.০০ টাকা।
মাসিক বাড়তি খরচ: ৩৪৫.৫০ টাকা।
টার্গেট যখন নিম্নমধ্যবিত্ত
পিডিবির হিসাবে দেশে ৪ কোটি ৩১ লাখ আবাসিক গ্রাহকের মধ্যে বড় একটি অংশই ২০০ ইউনিটের নিচে ব্যবহারকারী। সংস্থাটির দাবি, ‘লাইফলাইন’ (৫০ ইউনিট পর্যন্ত) ও প্রথম ধাপের (৭৫ ইউনিট) অতি দরিদ্র গ্রাহকদের তারা এই বৃদ্ধির আওতার বাইরে রাখছে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা একটি ফ্রিজ, ফ্যান ও টিভি ব্যবহার করেন তাদের ব্যবহার অনায়াসেই ৭৫ ইউনিট ছাড়িয়ে যায়। ফলে ‘গরিবের দাম বাড়বে না’—এই যুক্তির আড়ালে মূলত নিম্নমধ্যবিত্তের ওপরই বড় বোঝা চাপানো হচ্ছে।
উৎপাদন খরচ বনাম ভোক্তার দায়
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম এই প্রস্তাবকে ‘লুণ্ঠনমূলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, "সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ ও ভুল চুক্তির কারণে সৃষ্ট ঘাটতি মেটাতে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে। খরচ কমানোর উদ্যোগ না নিয়ে গ্রাহকের ওপর দায় চাপানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।"
জাতীয় কমিটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, তেল ও গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাজারের চেয়ে ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতেই এখন বছরে দুবার দাম সমন্বয়ের ‘অটোমেটিক ফর্মুলা’ চালুর পায়তারা করছে পিডিবি।
বিইআরসির ভূমিকা ও গণশুনানি
আগামী ২০ ও ২১ মে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এ বিষয়ে গণশুনানি ডেকেছে। পিডিবি চাইছে ১ জুন থেকেই নতুন এই বাড়তি দাম কার্যকর করতে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, কারিগরি কমিটির প্রতিবেদন ও শুনানির আলোচনার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিদ্যুৎ খাতের এই অস্থিরতা ও দফায় দফায় দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও উসকে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।