দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে কি শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে মধ্যপ্রাচ্যে? ভূ-রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি চূড়ান্ত সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জব্দ করা ২ হাজার কোটি ডলার ফেরত পাওয়ার শর্তে একটি ঐতিহাসিক চুক্তির দরকষাকষি চলছে।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু: ইউরেনিয়াম বনাম ডলার
মার্কিন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা। বিশেষ করে মাটির নিচে থাকা প্রায় ২ হাজার কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়াম নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরানের অর্থনীতির চাকা সচল করতে এখন বিশাল অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব: ২ হাজার কোটি ডলার ফেরত।
ইরানের অবস্থান: প্রাথমিকভাবে ২৭০০ কোটি ডলার দাবি করলেও এখন ২০০০ কোটিতে সমঝোতার ইঙ্গিত।
ইউরেনিয়াম নিষ্পত্তি: উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের কিছু অংশ তৃতীয় দেশে পাঠানো এবং বাকি অংশ ইরানে রেখেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে মান কমিয়ে ফেলা।
মধ্যস্থতায় পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসর
আগামী রোববার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার এই মহাগুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। গত ১১ এপ্রিল প্রথম দফার বৈঠকের পর পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্কের সমন্বিত মধ্যস্থতা এই আলোচনাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। আগামী শুক্রবার তুরস্কে সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গেও এ বিষয়ে মধ্যস্থতাকারীদের একটি বিশেষ বৈঠকের কথা রয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও 'ট্রুথ সোশ্যালে' লিখেছেন, "কোনো অর্থ লেনদেন হবে না"। তবে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, "আমরা চুক্তির খুব কাছাকাছি আছি। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমাদের দিয়ে দিতে রাজি হয়েছে।"
তবে খসড়া সমঝোতা স্মারক (MoU) নিয়ে এখনো কিছু বড় মতপার্থক্য রয়ে গেছে:
সময়কাল: যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত চায়, যেখানে ইরান বলছে ৫ বছরের কথা।
স্থাপনা: সব পারমাণবিক স্থাপনা মাটির ওপরে থাকতে হবে এবং মাটির নিচের বর্তমান স্থাপনাগুলো অকেজো করার শর্ত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তেল বিক্রি: ইরান চায় কোনো নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই মুক্তবাজারে তেল বিক্রি করতে।
সমঝোতা না হলে কি আবারও যুদ্ধ?
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি আলোচনাকে ‘ফলপ্রসূ’ বললেও বিস্তারিত প্রকাশ করেননি। তবে রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম নিশ্চিত করেছেন যে, ট্রাম্প সরাসরি ইরানিদের সঙ্গে কথা বলছেন। চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে আবারও যুদ্ধের দামামা বাজতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খোদ ট্রাম্প।
বিশ্ববাসী এখন ইসলামাবাদের দিকে তাকিয়ে। এই চুক্তি কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধেরই অবসান ঘটাবে না, বরং এটি হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা ফেরানোর চাবিকাঠি।
মুক্ত প্রভাত/আরআই