স্মৃতিটুকুই শুধু অবশিষ্ট রইল। সুদূর ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে বসে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত যে ‘তরুরাজ’কে নিয়ে লিখেছিলেন কালজয়ী সনেট, যশোরের সাগরদাঁড়ির সেই ঐতিহাসিক বটবৃক্ষটি আজ চিরতরে হারিয়ে গেল। শনিবার দুপুরে বয়ে যাওয়া প্রচণ্ড কালবৈশাখী ঝড়ে কপোতাক্ষ নদের তীরের এই মহীরুহটি উপড়ে পড়েছে। আর এর সাথেই অবসান ঘটল বাংলা সাহিত্যের এক জীবন্ত কিংবদন্তির।
ঝড়ের তাণ্ডবে শেষ স্মৃতিচিহ্ন
আজ দুপুর ১টার দিকে আকাশ কালো করে ধেয়ে আসে কালবৈশাখী। বাতাসের প্রচণ্ড গতিবেগে কবির বসতভিটার পূর্ব পাশে কপোতাক্ষের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বটগাছটি শিকড়সহ উপড়ে যায়। শতবর্ষী এই গাছটি ছিল পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। গাছটি পড়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে সাগরদাঁড়ির স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
ভার্সাই থেকে সাগরদাঁড়ি: কবিতার সেই বটবৃক্ষ
১৮৬৫ সালে অর্থাভাব আর প্রবাস জীবনের বিষণ্ণতার মাঝে বসে কবি লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত চতুর্দশপদী কবিতা ‘বটবৃক্ষ’। যেখানে তিনি গাছটিকে সম্বোধন করেছিলেন এভাবে—
‘বিধির করুণা তুমি তরু–রূপ ধরি।’
১৮৬৭ সালে প্রকাশিত এই কবিতার প্রতিটি চরণে ছিল শৈশবের সেই ছায়াসুনিবিড় আশ্রয়ের প্রতি কবির গভীর মমতা। আজ সেই স্মৃতিময় আশ্রয়টি হারিয়ে যাওয়ায় মধুপ্রেমী ও গবেষকদের মনে সৃষ্টি হয়েছে এক অপূরণীয় শূন্যতা।
ক্ষোভ ও আক্ষেপ
স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দা সুনীল হালদার (৭০) অশ্রুসজল চোখে বলেন, "এই গাছটি আমাদের কাছে শুধু গাছ ছিল না, ছিল কবির অস্তিত্বের অংশ। দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ আসত এই বটতলায় একটু শান্তির খোঁজে। আজ থেকে সেই ঠিকানাও হারিয়ে গেল।"
এদিকে মধুসূদন-গবেষক ও মধুসূদন একাডেমির পরিচালক কবি খসরু পারভেজ প্রশাসনের অবহেলা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, "আমরা বছরের পর বছর ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলাম এই ঐতিহাসিক গাছটি সংরক্ষণের জন্য। কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অবহেলা আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই কবির শেষ স্মৃতিচিহ্নটি আজ মাটির সাথে মিশে গেল।"
ঐতিহ্যের অবসান
সাগরদাঁড়ির কপোতাক্ষ নদ আজো বইছে, কবির স্মৃতিধন্য মধুপল্লীও দাঁড়িয়ে আছে; কিন্তু নেই শুধু সেই ‘তরুরাজ’। প্রকৃতির নিয়মে আসা ঝড় হয়তো একটি গাছকে উপড়ে দিয়েছে, কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সেই বটবৃক্ষটি কবির পঙক্তিতে চিরকাল অম্লান হয়েই থাকবে। তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন—আমাদের জাতীয় স্মারকগুলো রক্ষায় আমরা আর কতকাল এমন উদাসীন থাকব?