বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক জোটের সর্বাধাত্মক হামলা সত্ত্বেও ইরানকে নতজানু করা যায়নি। বরং কয়েক সপ্তাহের তীব্র লড়াই শেষে এটি স্পষ্ট যে, তেহরান কেবল তার রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অটুটই রাখেনি, বরং ‘অপ্রতিসম যুদ্ধে’ পশ্চিমা শক্তির সীমাবদ্ধতাগুলোও বিশ্বের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছে। সমকালীন ভূ-রাজনীতিতে একে ইরানের বড় ধরণের ‘কৌশলগত বিজয়’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ ওয়াশিংটন ও তেল আবিব
মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী এই যুদ্ধের শুরুতে যে ঘোষণা দিয়েছিল—ইরানের ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং পারমাণবিক সক্ষমতা চিরতরে ধ্বংস করা—তার একটিও সফল হয়নি। তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে হামলা হলেও সরকারের কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান প্রমাণ করেছে যে, কেবল উন্নত প্রযুক্তি দিয়েই একটি আদর্শিক বাহিনীকে পরাজিত করা সম্ভব নয়।
হরমুজ প্রণালি: তেহরানের অজেয় অস্ত্র
যুদ্ধের ময়দানে সামরিক ক্ষয়ক্ষতির চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে ইরানের অর্থনৈতিক প্রতিরোধ। হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে তেহরান কার্যত বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে জিম্মি করতে পেরেছে। জাহাজ চলাচলে ইরানের কড়াকড়ি এবং পাল্টা হামলার হুমকিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করেছে। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত ১০ দফা শান্তিনীতিতে ইরানের এই প্রভাবের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির দাবি এখন আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।
নৈতিক পরাজয় বনাম প্রতিরোধের জয়
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বলছে, যুদ্ধে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু এবং বালিকা বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘নৈতিক পরাজয়’ নিশ্চিত করেছে। পক্ষান্তরে, ইরান নিজেকে একটি ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে’ থাকা পক্ষ হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে। বিশ্লেষক ফিরাস আবু হেলালের মতে, যখন কোনো পক্ষ ধ্বংস হওয়া এড়িয়ে টিকে থাকতে পারে এবং তাদের মূল আদর্শিক কাঠামো ধরে রাখে, তখন অপ্রতিসম যুদ্ধের ব্যাকরণ অনুযায়ী তারাই বিজয়ী।
জনসমর্থনের নতুন জোয়ার
ইরানের অভ্যন্তরে যুদ্ধের প্রভাব উল্টো ফল বয়ে এনেছে পশ্চিমা শক্তির জন্য। অভ্যন্তরীণ বিভেদ ভুলে দেশটির সাধারণ মানুষ এবং কুর্দিদের মতো সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোও বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছে। এটি তেহরানের রাজনৈতিক বৈধতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
সব মিলিয়ে, সমরশক্তি দিয়ে ইরানকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার যে পরিকল্পনা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র করেছিল, তা আপাতত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। যুদ্ধবিরতির এই ক্ষণে তেহরান কেবল ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা উঁচু করেই দাঁড়ায়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের উপস্থিতিকে আরও অপরিহার্য করে তুলেছে।