৩০ মার্চ, ২০২৬

রাজশাহী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে হাম, এক মাসে আক্রান্ত ১২ শিশুর মৃত্যু

রাজশাহী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে হাম, এক মাসে আক্রান্ত ১২ শিশুর মৃত্যু

চলতি মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ১২ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সবশেষ বৃহস্পতিবার রাজশাহী মেডিকেলে চিকিৎসাধীন যে চার শিশুকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে তিন শিশুই মারা গেছে।

বেঁচে থাকা শিশু জান্নাতুল মাওয়াকে গত শনিবার বিকেলে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া হামে আক্রান্ত আরো তিন শিশুকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ছোঁয়াচে এই রোগের সংক্রমণ বেশি ছড়িয়ে পড়েছে রাজশাহী অঞ্চলের পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলায়। রোগটি অত্যান্ত ছোঁয়াচে হলেও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের সঙ্গেই হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ফলে সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হাসপাতালের তথ্য বলছে,  মার্চ মাসজুড়ে রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাম আক্রান্ত যে ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তার মধ্যে আইসিইউতে নেওয়ার পর মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের। বাকি তিন শিশু আইসিইউতে নেওয়ার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তবে হাম নিয়ে রাজশাহী মেডিকেলের সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া শিশুদের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। 

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্র বলছে, গত ১৮ মার্চ রাজশাহী বিভাগের ১৫৩ রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায়। এর মধ্যে ৪৪ জনের হাম পজেটিভ ধরা পড়েছে। আক্রান্তের হার ধরা হয়েছে ২৯ শতাংশ।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, মার্চের শুরু থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলের হাম আক্রান্ত ৮৪ রোগীকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। এরমধ্যে আইসিইউতে নেওয়ার পরও মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের। এছাড়া আইসিইউয়ের অপেক্ষায় থাকা তিন শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

এদিকে শনিবার (২৮ মার্চ) সকাল পর্যন্ত পাবনায় হাম আক্রান্ত ২৬ শিশু চিকিৎসাধীন। তাদের ‘হাম ওয়ার্ডে’ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে পাবনায় হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি শনিবার পর্যন্ত। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত তিন মাসে হাম আক্রান্ত ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার সকালেও হাম নিয়ে ভর্তি ছিল ৭০ শিশু।

শিশু ও নবজাতক বিভাগের কনসালট্যান্ট মাহফুজ রায়হান জানালেন, শনিবার সকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ৭০ শিশু ভর্তি থাকলেও বিকেলে ২০জনকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। তাদের হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে তিন মাসে যে ৪ শিশু মারা গেছে, তারমধ্যে চলতি মাসেই দুইজন। অত্যান্ত ছোঁয়াচে বলে গত তিন মাস ধরে হাম আক্রান্ত শিশুদের তারা পৃথক ওয়ার্ডে চিকিৎসা দিচ্ছেন তারা। 

হাম আক্রান্ত নিহত শিশুর স্বজনরা জানিয়েছেন, রাজশাহী মেডিকেলে চিকিৎসাধীন জহির, হুমায়রা, হিয়া ও জান্নাতল মাওয়াকে আইসিইউতে নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। এর মধ্যে শুক্রবার মারা গেছে জহির, হুমায়রা ও হিয়া। শিশু হিয়ার পিতা রিফাত হোসেন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, তার শিশু সন্তানকে আইসিইউতে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। বাধ্য হয়ে অপেক্ষায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত আইসিইউ পাওয়ার আগেই তার বুকের ধন পৃথিবী ছেড়ে গেল। এখন আর খোঁজ নিয়ে কী হবে?

হামে আক্রান্ত শিশু জান্নাতুল মাওয়ার পিতা হৃদয় বলেন, অনেক চেষ্টা আর অপেক্ষার পর তার মেয়েকে শনিবার আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে। আশেপাশের শিশুদের মৃত্যু দেখে তিনিও ভেঙে পড়েছেন।

রাজশাহী মেডিকেলের শিশু বিভাগের প্রধান শাহিদা ইয়াসমিন হাম আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। হাসপাতালের পরিচালকও ফোন ধরেননি। তবে হাসপাতালের মুখপাত্র শঙ্কর কে বিশ্বাস বলেন, হামের রোগীদের নিয়ে তারা বৈঠক করেছেন। ‘সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে’ প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সেখানে রোগী পাঠা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া শনিবার থেকে হাসপাতালের ২৪ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ড হাম আইসোলেশন কর্নার করা হয়েছে। সেখানে ভর্তি রেখে হামের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

শনিবার বিকেলে হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে হাম আইসোলেশন কর্নার পাওয়া যায়নি। তবে ১০ নম্বর ওয়ার্ডে ডায়রিয়া ও ডেঙ্গু কর্নারের সাইনবোর্ডের সঙ্গে হাম কর্নার লেখা দুটি কাগজ রয়েছে। এই কর্নারের রোগীর স্বজনেরা বলেন, ডায়রিয়া নিয়ে তারা শিশুদের ভর্তি করেছেন।

এদিকে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় শিশুকে নিয়ে ভর্তি আছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বারোরসিয়া গ্রামের মোহাম্মদ ওয়াসিম। তিনি বলেন, তিন দিন আগে তার শিশুকে ঠান্ডাজনিত রোগ নিয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন। একই ওয়ার্ডে হাম আক্রান্ত অনেক শিশুই ভর্তি রয়েছে। এই তিন দিনে তার শিশুও হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে।

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের পরিস্থিতি দেখতে তিনি ইতিমধ্যে পাবনা গিয়েছিলেন। তার মতে, পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের অবস্থা বেশি খারাপ। হাম ছড়িয়ে পড়ায় বিভাগীয়সহ সব জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা হাসপাতালগুলোয় তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনায় আক্রান্ত রোগীদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।#মো. রাশিদুল ইসলাম  ০১৭৫০-৯৫২৮৭৫  ২৯-০৩-২৬