২৭ মার্চ, ২০২৬

হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে, জ্বালানি তেলের বাজার লন্ডভন্ড, শঙ্কায় বিশ্ব

হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে, জ্বালানি তেলের বাজার লন্ডভন্ড, শঙ্কায় বিশ্ব

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের জেরে গত চার সপ্তাহ ধরে অচল হয়ে আছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি। এই অচলাবস্থার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পারস্য উপসাগরের এই সরু প্রবেশপথের উভয় পাশে এখন প্রায় দুই হাজার পণ্যবাহী জাহাজ আটকা পড়ে আছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি এখন কার্যত একটি ‘কিল জোন’ বা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। একদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হুমকি, অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর পাল্টা প্রস্তুতির মাঝখানে পড়ে স্থবির হয়ে গেছে বিশ্ব বাণিজ্য।

সংকটের কেন্দ্রে ২০ শতাংশ জ্বালানি
বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। শুধু জ্বালানি নয়, বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত সারের একটি বড় অংশও এই পথ দিয়ে আসে। ফলে দীর্ঘায়িত এই সংকট এখন বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্রাম্পের আল্টিমেটাম ও ‘এসকর্ট’ পরিকল্পনা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অচলাবস্থা কাটাতে একাধারে কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগ করছেন। তিনি ইরানকে আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন প্রণালিটি খুলে দেওয়ার জন্য। ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রয়োজনে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের পাহারায় (এসকর্ট) বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পার করে দেওয়া হবে। এর জন্য মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত কয়েক হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

গত ২৩ মার্চ এক বিবৃতিতে ট্রাম্প কিছুটা রহস্যজনকভাবে বলেছিলেন, ‘আমি আর আয়াতুল্লাহ মিলে হরমুজ নিয়ন্ত্রণ করব।’ তবে বাস্তবে উত্তজনা কমার কোনো লক্ষণ নেই।

ইরানের ‘অপ্রচলিত’ রণকৌশল
সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে থাকলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হরমুজ প্রণালিতে ইরান সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। দেশটির প্রায় এক হাজার মাইল দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং অসংখ্য ছোট ছোট দ্বীপ ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি লুকিয়ে রাখার জন্য আদর্শ।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) ফেলো নিক চাইল্ডস বলেন, ‘ইরান এখানে প্রথাগত যুদ্ধের চেয়ে অপ্রচলিত যুদ্ধপদ্ধতি বেশি ব্যবহার করছে। সস্তা ড্রোন, ছোট দ্রুতগামী নৌযান এবং সামুদ্রিক মাইনের ব্যবহার মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

সাগরে নতুন ‘টোল’
অচলাবস্থার মধ্যেও ইরান বিকল্প উপায়ে অর্থ আয়ের পথ খুঁজছে। লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত দুটি জাহাজ নিরাপদে পার করে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানকে মোটা অঙ্কের ‘ফি’ বা টোল পরিশোধ করেছে। ইরানি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, নির্দিষ্ট শর্ত ও অর্থ পরিশোধ সাপেক্ষে তারা কিছু জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জার্নাল এডিটর কেভিন রোল্যান্ডস সিএনএনকে বলেন, ‘উন্মুক্ত সমুদ্রে রুট পরিবর্তনের সুযোগ থাকে, কিন্তু হরমুজের মতো চোকপয়েন্টে সেই সুযোগ নেই। এটি একটি সংকীর্ণ পথ যেখানে ইরানকে লক্ষ্যবস্তু খুঁজতে হয় না, তারা কেবল বসে অপেক্ষা করলেই চলে।’

আপাতত সবার নজর ৬ এপ্রিলের দিকে। ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে ইরান পিছু না হটলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।