চলনবিলের ৪২৮৬ হেক্টর আয়তনবিশিষ্ট ২২টি নদীই এখন অস্তিত্ব সংকটে। সংকটে পড়েছে ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট ২২টি খালও। প্রভাবশালীরা দখল ও দূষণ অব্যহত রাখায় এসব নদী-খাল যৌবন হারিয়ে ধুঁকছে। নদী অঞ্চলে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ধেয়ে আসলেও ধুঁকতে থাকা এসব নদী-খাল রক্ষায় সরকারি কোনো কর্যকর পদক্ষেপ নেই।
নদী এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দখল-দূষণে নদীনালার পানিপ্রবাহ হ্রাস ও গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন, কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণ, বিলের বুক চিরে সড়ক-ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ ও পলি জমে ভরাট হওয়ায় পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে চলনবিল কেন্দ্রীক আত্রাই, নন্দকুঁজা ও গুমানী, বড়ালসহ ২২টি নদনদী। নদীর গতি প্রকৃতি হারানোয় গত ৫ দশকে চলনবিলে পানির সম্পন্ন এলাকা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৬ বর্গকিলোমিটারে। দাঁড়িয়েছে। বিলের জলজ বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্রও হুমকির মুখে পড়েছে।
১৮৮১ সালে প্রকাশিত ‘ইম্পেরিয়েল গেজেট অব ইন্ডিয়া’ নামের ব্রিটিশ-ভারতের ঐতিহাসিক গ্রন্থে নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ৪২৮৬ হেক্টর আয়তনবিশিষ্ট আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানী, গুড়, করতোয়া, বড়াল, তুলসিগঙ্গা, চেঁচিয়া, ভাদাই, চিকনাই, রূপনাই, বানগঙ্গাসহ ২২টি নদী এবং ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট ২২টি খালের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া অতীতে ২৩ হাজারের মতো বড় বড় পানির আধারের পাশাপাশি নবীরহাজির জোলা, হক সাহেবের খাল, নিমাইচড়া খাল, বেশানীর খাল, গুমানী খাল, উলিপুর খাল, সাঙ্গুয়া খাল, দোবিলা খাল, কিশোরখালির খাল, বেহুলার খাড়ি, বাকইখাড়া, গোহালখাড়া, গাড়াবাড়ি খাল, কুমারভাঙ্গা খাল, জানিগাছার জোলা ও সাত্তার সাহেবের খালের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব নদী আর খালকে কেন্দ্র করে গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড়, নাজিরপুর, সিংড়ার, বড়াইগ্রামের আহম্মেদপুর, তাড়াশের ধামাইচ, নাদোসৈয়দপুর, চাটমোহরের ছাইকোলা, অষ্টমনিষা, মির্জাপুর ভাঙ্গুড়া, নওগাঁওসহ সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছিল বড় নৌবন্দর। কিন্তু এসব এখন প্রবীণ ব্যক্তিদের স্মৃতির পাতায় আশ্রয় নিয়েছে।
মূলত পদ্মায় জন্ম নিয়ে যমুনায় মিলিত হয়েছে ২২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নদীর পেট চিরে জন্মেছে নদীনালা, খাল-বিল। পদ্মা-যমুনার পানি এই নদী হয়েই গড়িয়ে পড়ত দেশের সর্ববৃহৎ চলনবিলে। অথচ ৫০০ ফিট প্রস্থের নদীটির উৎসমুখে ১৯৮৪ সালে নির্মিত হয়েছে তিন কপাটের একটি সরু স্লুুইসগেট। সেই থেকে বড়াল তার যৌবন হারিয়েছে। একই সঙ্গে চলনবিলের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ২২টি নদী, শ দুয়েক নালা এবং অন্তত ২৫০টি বিল মৃতপ্রায় হয়ে গেছে।
বড়াল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্যসচিব এস এম মিজানুর রহমান ইত্তেফাককে জানান, বড়াল নদীতে অপরিকল্পিতভাবে স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে ৩৮ বছরে ২২০ কিলোমিটার নদীর মধ্যে বড়ালের ১২০ কিলোমিটার বেদখল হয়েছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ফারাক্কার বাঁধের বিরূপ প্রভাব পড়েছে চলনবিলে। চারঘাট পৌরসভা বড়াল নদীর ১৪০০ ফিট দখল করে মার্কেট-স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এছাড়া পাবনার আটঘরিয়া থেকে বনপাড়া পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার নদী দখল করে সরকারি অফিসসহ ব্যক্তিমালিকানায় বহু স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। বড়ালে পানির প্রবাহ না থাকায় সংকটে পড়েছে অন্যান্য নদীও।
সরকারের পানি উন্নয়ন বোর্ডের ট্রাস্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে নাটোর, পাবনা, সিরাজঞ্জের অন্মুক্ত বিলে পোল্ডারের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়ে ১৪তে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে বিল ও নদীতে পানি নিয়ন্ত্রণের স্থাপনার সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়ে হয় ১৮০। ফলাফল হিসেবে ২৩০ বর্গকিলোমিটার কমে ঐ বছরের শুষ্ক মৌসুমে ২২ নদী ২২ খালের বেশিরভাগেই পানি ছিলনা। কেবল চলনবিলের মাত্র ৮০ বর্গকিলোমিটারে পানি ছিল। ২০১৫ সালের দিকে পোল্ডারের সংখ্যা বেড়ে ১৫ হয়। পানি নিয়ন্ত্রণমূলক স্থাপনার সংখ্যা হয় ২১৫।
খনন হলেও ফেরেনি নাব্যতা :
চলনবিলের বুক চিড়ে যে কয়টি নদীর প্রবাহ তার মধ্যে অন্যতম বড়াল, আত্রাই, গুমানী ও তুলশীগঙ্গা। বাঘাবাড়ী থেকে উত্তর জনপদের প্রায় আটটি জেলাতে নৌ চলাচলের মাধ্যম ছিল এসব নদী। জৌলুশ ফেরাতে বছর দুয়েক আগে এই চারটি নদীর কিছু কিছু অংশ খনন করা হয়েছে। নদী খনন করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নাব্যতা ফেরেনি। ফলে বিল আর নদীতে প্রয়োজনীয় পানি না থাকায় ভূগর্ভস্ত পানির স্তরও আশঙ্কাজনকহারে নিচে নেমেছে।
নদী রক্ষা আন্দোলনের মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, দখলের কবলে পড়ে চলনবিল এবং নদী নালায় পানির সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া চলনবিল অঞ্চলের কয়েকটি শিল্প কারখানার তরল বর্জ্য বড়াল, নন্দকুঁজাসহ কয়েকটি নদীর পানিতে মিশে দূষণ সৃষ্টি করায় পরিবেশে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্যও।
চলনবিল ও এখানকার বাস্তুতন্ত্র নিয়ে গবেষণা করছেন বাস্তুতন্ত্র গবেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যপক ড. মো. মনিরুজ্জামান সরকার। তিনি মনে করেন, চলনবিল শুধু একটি বৃহৎ বিল-ই নয়, এটি একটি বৃহৎ জলজ বাস্তুতন্ত্রের আধার। অথচ নদী খাল অস্তিত্ব হারানোয় চলনবিল এখন সংকটে পড়েছে। নদী রক্ষায় তিনি সিএস নকসা অনুযায়ী চলনবিল এলাকার সব নদী, খাল ও জলাশয়ের সীমানা নির্ধারণ করে দখল ও দূষণমুক্ত করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত দাবি জানান।
নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, বছরখানেক আগে ‘বড়াল নদীর অববাহিকায় পানি সম্পদ পুনরুদ্ধার’ নামে একটি প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়ে ২ হাজার ৫২ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের আওতায় বড়াল নদীর ১০৪ কিলোমিটার, নারোদ নদীর ৪৩ কিলোমিটার এবং মুসাখাঁ নদীর ৬ কিলোমিটার খননের কথা বলা হয়েছে।
নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রিফাত করিম জানান, নদী খননে বর্তমানে নতুন কোনো প্রকল্প নেই। তবে কয়েকটি নদী খননের জন্য সমীক্ষা চলছে।