১৩ মার্চ, ২০২৬

গুরুদাসপুরের এক গ্রামের ৯ ব্যক্তি অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত

গুরুদাসপুরের এক গ্রামের ৯ ব্যক্তি অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত

অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গরু জবাইয়ের পর একটি গ্রামের অন্তত ৯ নারী-পুরুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ছানারুল সরকার নামের এক ব্যক্তির অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনিসহ তিনজন রাজশাহী মেডেকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। শনিবার (৬ মার্চ) থেকে এসব ব্যক্তিদের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের লক্ষণ দেখা দেয়।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৪ মার্চ) সকালে গুরুদাসপুর উপজেলা সদরের অদূরের চলনালী গ্রামের আবদুল গফুরের অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত লাখ টাকা মূল্যের একটি গরু জবাই করা হয়। রোগাক্রান্ত গরুটি জবাইয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৮ ব্যক্তির শরীরে অ্যানথ্রাক্সের সক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রন্তরা সবাই চলনালী গ্রামের বাসিন্দা।

স্থানীয় লোকজন ইত্তেফাককে বলেন, গরুর অ্যানথ্রক্স আক্রান্তের ঘটনা এই গ্রামে এটিই প্রথম। জবাই করা গরুটি যে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত তা কেউ বুঝতে পারেননি। আক্রান্ত গরুর মাংস গ্রামের মানুষের কাছে তুলনামূলক কমদামে বিক্রি করা হয়েছে। অনেকেই মাংস রান্না করে খেলেও বেশিরভাগ মানুষ ফ্রিজে সংরক্ষণ করেছিলেন। 

ইউপি সদস্য আবদুল কাদের বলেন, প্রথমে ছানারুলের মুখমণ্ডলে চুলকানির মতো ফোসকা বের হয়। এর পর একদিনের ব্যবধানে আরো ৭ ব্যক্তির শরীরে একই ধরণের লক্ষণ পাওয়া যায়। আক্রান্ত ব্যক্তিরা হলেন- গোলাম মোস্তফা চুন্টু সরকার, ছানারুল সরকার, আসাদ মোল্লা, লাভলি বেগম, রাহুল সরকার, আবদুর রহিম সরকার, আলতাব হোসেন ও খাদিজা বেগম। এদের মধ্যে গালাম মোস্তফা চুন্টু রোগ নিরাময়ে কোনো চিকিৎসা নেননি। বাকিরা চিকিৎসাধীন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আক্রান্ত যুবক রাহুল বলেন, পরিবারের মধ্যে তিনি এবং তার পিতা ছানারুল অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন। তার বাম হাতে ফোসকা বের হয়। তবে বিশেষ করে তার পিতা ছানারুলের মুখমণ্ডলের বাম গাল থেকে চোখেও সংক্রমণ ছড়িয়েছে। এতে মুখমণ্ডল এবং গলা ফুলে গেছে। সংক্রমিত স্থানে চুলকানির সঙ্গে বেড়েছে ব্যাথাও।

অ্যানথ্রাক আক্রান্ত আসাদ মোল্লা বলেন, হাত-পাসহ তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়েছে। তিনিও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আক্রান্ত ব্যক্তি আবদুর রহিম সরকার বলেন, আক্রান্ত গরুটি জবাই করা থেকে শুরু করে মাংস ছাড়ানো পর্যন্ত তিনি যুক্ত ছিলেন। শনিবার তার ডান হাতের একটি আঙ্গুলে চুলকানির মতো বের হয়েছিল। হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারেন তিনি অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত হয়েছেন। এর আগে তিনি অ্যানথ্রাক্স রোগ সম্পর্কে কিছু জানতেন না। 

অ্যান্যথ্রাক্স সংক্রমণের ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পর গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি টিম অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে গত বৃহস্পতিবার চলনালী গ্রামে যায়। ওই টিমের চিকিৎসক অহিদুজ্জামান রুবেল বলেন, ‘অ্যানথ্রাক’ রোগীদের তালিকা প্রস্তুত করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অ্যানথ্রাক্স মূলত তিন ধরণের হয়ে থাকে। দুইটি ধরণ নিশ্বাসের মাধ্যমে পেটের ভেতর গিয়ে প্রাণহানিও ঘটাতে পারে। তবে গুরুদাসপুরে শুধু চামড়ার ওপরেই এই রোগটি দেখা গেছে। তিনি বলেন, এর আগেও গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের চাকআদালত-খাঁ ও মামুদপুর গ্রামের ১২ ব্যক্তি ‘অ্যানথ্রাক্স’ আক্রান্ত হয়েছিলেন। নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ নিরাময় হয়েছে।

এদিকে গ্রামে ‘অ্যানথ্রাক্সে’র প্রাদুর্ভাব নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে রোগ তত্ত, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের একটি টিম। গবেষণা টিমের প্রধান চিকিৎসক অধ্যপক রহমান বলেন, চলনালী গ্রামের ৮জন নারী-পুরুষের শরীরে ‘অ্যানথ্রাক্সে’র মতো সংক্রমণ পাওয়া গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষতস্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয়রা বলেন, গবাদি পশুর মাধ্যমে অ্যানথ্রাক্স রোগটি মানবদেহে ছড়াচ্ছে। এই রোগের কারণে গরুর পরিচর্যা থেকে শুরু করে মাংস খেতেও ভয় পাচ্ছেন গ্রামের মানুষ। আতংক দূর করতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সচেতনামূলক উদ্যোগ চান তারা।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান বলেন, চলনালী গ্রামে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত যে গরুটি জবাই করা হয়েছিল, তার বেশিরভাগ মাংস মাটিতে গর্ত করে পুঁতে ফেলা হয়েছে। অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে গবাদি পশুর শরীরে টিকাদানও অব্যহত রাখা হয়েছে।