৯ মার্চ, ২০২৬

দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে কর্মচাঞ্চল্যে মুখর সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লি

দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে কর্মচাঞ্চল্যে মুখর সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লি

দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ও মন্দা কাটিয়ে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে বাংলাদেশের তাঁত শিল্পের রাজধানী হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জ। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এখন জেলার বেলকুচি, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, এনায়েতপুর ও সদর উপজেলার তাঁত কারখানাগুলোতে চলছে দম ফেলার ফুরসতহীন ব্যস্ততা। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাঁত মেশিনের ‘খটখট’ শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো অঞ্চল।

পুরোদমে চলছে উৎসবের প্রস্তুতি
সরেজমিনে দেখা যায়, ঈদের বাজার ধরতে তাঁতিরা এখন দিন-রাত এক করে কাজ করছেন। জেলার তাঁত পল্লিগুলোর প্রতিটি ঘরেই যেন এক মহোৎসব। সুতা প্রস্তুত, রঙ করা এবং তাঁত মেশিনে নিখুঁত নকশা ফোটানোর কাজে ব্যস্ত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রায় সব বয়সীরা। পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণ এই শিল্পকে এক অনন্য পারিবারিক ঐতিহ্যের রূপ দিয়েছে। বর্তমানে বাজারে চাহিদার কথা মাথায় রেখে তাঁতিরা জামদানি, সুতি জামদানি, কাতান, বেনারসি, সিল্ক এবং হাফসিল্কের মতো বাহারি সব শাড়ি তৈরিতে মনোনিবেশ করেছেন।

শ্রমিক ও মালিকদের প্রত্যাশা
বেলকুচির তাঁত পল্লির প্রবীণ শ্রমিক সাইফুল ইসলাম দীর্ঘদিনের মন্দার পর কাজের এই জোয়ারে বেশ উৎফুল্ল। তিনি বলেন, “ঈদের সময়টা আমাদের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। কাজের চাপ বেশি থাকলে পারিশ্রমিকও বেশি পাওয়া যায়, তাই এই কষ্টটুকু আমাদের কাছে আনন্দের।”

তবে কাঁচামালের চড়া দাম নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তাও রয়েছে তাঁত মালিকদের। বেলকুচির এক তাঁত মালিক উজ্জ্বল অধিকারী জানান, সুতা ও রঙের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকায় উৎপাদন খরচ অনেক গুণ বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, “গত কয়েক বছর ধরে তাঁত শিল্পে ভয়াবহ মন্দা চলছিল। ঈদকে সামনে রেখে আমরা নতুন করে স্বপ্ন দেখছি। কাঁচামালের বাজার যদি সরকার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, তবে আমরা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে পারব।”

অর্থনীতিতে তাঁত শিল্পের প্রভাব
সিরাজগঞ্জের প্রায় ৯টি উপজেলাজুড়ে প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই তাঁত শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। জেলা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় ৫ লাখ হ্যান্ডলুম ও পাওয়ারলুম থেকে উৎপাদিত শাড়ি দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেটসহ দেশের বড় বড় পাইকারি বাজারে সিরাজগঞ্জের শাড়ির চাহিদা তুঙ্গে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, ঈদের এই মৌসুমে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়, যা পুরো জেলার অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনার দাবি
একসময়ের বিশ্বখ্যাত এই শিল্পটি এখন নানা সংকটে ধুঁকছে। আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, কাঁচামালের উচ্চমূল্য এবং পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, “সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য। কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রণোদনার অভাবে এই শিল্প তার জৌলুস হারাচ্ছে। আমরা সরকারের কাছে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং কাঁচামালের দাম নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছি।”

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
তাঁত সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে। তাঁতিদের হাতের জাদুকরী নকশা আর আধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণে তৈরি এই শাড়িগুলো আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং হিসেবে পরিচিতি পাবে। আপাতত, ঈদুল ফিতরের এই ব্যস্ততা তাঁতিদের মনে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন জাগিয়ে তুলেছে।