আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে হাইপারসনিক গতি বা দামী স্টিলথ প্রযুক্তি নয়, বরং স্বল্পমূল্যের ‘কামিকাজে’ বা আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে ইরান। বিশেষ করে শাহেদ-১৩১ ও ১৩৬ সিরিজের ড্রোনগুলো এখন ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে। মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলারের এই ড্রোন মোকাবিলা করতে প্রতিপক্ষকে খরচ করতে হচ্ছে মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র।
শাহেদ ড্রোনের কারিগরি সক্ষমতা
শাহেদ ড্রোন মূলত একটি ছোট ডেল্টা-উইংবিশিষ্ট উড়ন্ত ক্ষেপণাস্ত্র। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
খরচ: একেকটি ড্রোন তৈরিতে খরচ মাত্র ২০,০০০ থেকে ৫০,০০০ মার্কিন ডলার।
বিস্ফোরক: এটি ৪০ থেকে ৯০ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে পারে।
ইঞ্জিন: এতে রয়েছে ফোর-সিলিন্ডার পিস্টন ইঞ্জিন, যা প্রপেলার দিয়ে চলে। এর গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৮৫ কিমি।
শনাক্তকরণ: আকৃতিতে ছোট হওয়ায় এবং রাডার ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতা থাকায় এটি শনাক্ত করা বেশ কঠিন।
ইরানের রণকৌশল: ‘ড্রোনের ঢেউ’
ইরানের মূল কৌশল হলো বিপুল সংখ্যায় ড্রোন উৎক্ষেপণ করা। মার্কিন প্যাট্রিয়ট বা থাড-এর মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখতে ইরান শত শত ড্রোনের ‘ঢেউ’ পাঠায়। যখন এই সস্তা ড্রোনগুলো ধ্বংস করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখনই ইরান বড় ও শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নিখুঁত হামলা চালায়।
খরচ বনাম ধ্বংসের অসম লড়াই
বিশ্লেষকদের মতে, শাহেদ ড্রোনের সবচেয়ে বড় সাফল্য এর অর্থনৈতিক সমীকরণে। একটি ২০ হাজার ডলারের ড্রোন ভূপাতিত করতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে প্রায় ৪০ লাখ (৪ মিলিয়ন) ডলার মূল্যের রকেট খরচ করতে হয়। ড্রোনটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও অর্থনৈতিকভাবে ইরানই লাভবান হচ্ছে, কারণ প্রতিপক্ষের বিপুল অর্থ ও গোলাবারুদ ক্ষয় হচ্ছে।
"৪ বছর আগে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্ব এই উৎপাদন খরচ ও ধ্বংস করার খরচের বিশাল ব্যবধানের কোনো সমাধান খুঁজে পায়নি।" — নিউইয়র্ক টাইমস
বৈশ্বিক প্রভাব ও মার্কিন প্রতিক্রিয়া
শাহেদ ড্রোনের কার্যকারিতা দেখে এখন খোদ যুক্তরাষ্ট্রও একই পথে হাঁটছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এখন শাহেদের আদলে ‘লুকাস’ (LUCAS) বা লো কস্ট আনক্রিউড কমব্যাট সিস্টেম তৈরি করেছে। যার একেকটির উৎপাদন খরচ প্রায় ৩৫ হাজার ডলার। গত ডিসেম্বরে মধ্যপ্রাচ্যে ‘টাস্কফোর্স স্করপিয়ন স্ট্রাইক’ নামে নিজেদের প্রথম আত্মঘাতী ড্রোনের স্কোয়াড্রন চালু করেছে ওয়াশিংটন।
২০২৫ সালের জুন মাসে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ এবং বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধে এই ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার প্রমাণ করেছে যে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ আর কেবল দামী অস্ত্রের ওপর নির্ভর করবে না, বরং সস্তা ও কার্যকর প্রযুক্তির সংখ্যাধিক্যই হবে জয়ের চাবিকাঠি।