যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক কৌশলের মূল ভিত্তি ছিল—ন্যূনতম মার্কিন প্রাণহানি এবং অর্থনীতিতে সামান্য প্রভাবে বিদেশের মাটিতে সামরিক বিজয়। ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে আটক বা হুতিদের ওপর হামলার ক্ষেত্রে এই কৌশল সফল হলেও, ইরানের মাটিতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র শুরুতেই সেই ধারণা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
চড়া মূল্য দিচ্ছে ওয়াশিংটন
যুদ্ধের মাত্র ষষ্ঠ দিনেই ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধাক্কা। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্ররা ক্রমাগত হামলার শিকার হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজার টালমাটাল এবং ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে। ক্যাটো ইনস্টিটিউটের গবেষক জন হফম্যানের মতে, ট্রাম্প নিজেকে 'ধরাছোঁয়ার বাইরে' ভাবলেও ইরানের পরিস্থিতি ভেনেজুয়েলার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এর খেসারত ইতিমধ্যেই দিতে হচ্ছে।
মানবিক বিপর্যয় ও তদন্তের মুখে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিমান হামলায় ১৭৫ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এই ঘটনার তদন্তের কথা বললেও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রাথমিক ইঙ্গিতে এই ভয়াবহ হামলার দায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই বর্তাচ্ছে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
‘অনন্ত যুদ্ধের’ পদধ্বনি
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্ট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটছে না, বরং আরও বোমারু ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে হামলার গতি বাড়াচ্ছে। তবে ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জ্যাসন ক্রো সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও সেই ‘অনন্ত যুদ্ধের’ (Endless War) পথে পা বাড়াচ্ছে, যা কয়েক দশক ধরে মার্কিন নাগরিকদের প্রাণ ও অর্থ কেড়ে নেবে।
বিশ্লেষকদের ভিন্ন মত
এলিয়ট আব্রামস (কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস): তিনি মনে করেন, মার্কিন সেনার মৃত্যু দুঃখজনক হলেও ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদী লাভ হবে। এর ফলে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা চিরতরে ধ্বংস করা সম্ভব হবে।
জন হফম্যান (ক্যাটো ইনস্টিটিউট): তিনি উল্টো হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানে বিভক্তি তৈরি করলে তা মধ্যপ্রাচ্যে এক নজিরবিহীন ছায়া যুদ্ধ এবং ব্যাপক শরণার্থী সংকটের জন্ম দেবে। এমনকি আইএসআইএসের মতো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে পুনরুত্থিত হতে পারে।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যেখানে মার্কিন স্থলবাহিনীর জন্য অপেক্ষা করার ঘোষণা দিয়েছেন, সেখানে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো সরাসরি স্থল সেনা পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। তবে হোয়াইট হাউস ইরানের জনগণকে বিদ্রোহ করার ডাক দিয়েছে। সব মিলিয়ে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ কি ট্রাম্পের জন্য আরেকটি পালক হবে, নাকি ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের মতো কোনো চোরাবালিতে পরিণত হবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।