৪ মার্চ, ২০২৬

তেহরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকে সরছে ওয়াশিংটন: দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্য

তেহরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকে সরছে ওয়াশিংটন: দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্য

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযান শুরুর চার দিন পর ইরানের রণক্ষেত্রে দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তেহরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থায় দ্রুত ধস নামানোর যে প্রাথমিক লক্ষ্য নিয়ে এই হামলা শুরু হয়েছিল, তা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। মাঠের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে খোদ মার্কিন প্রশাসনই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তাদের আগের হিসাব-নিকাশ পুনর্মূল্যায়ন করতে হচ্ছে।

লক্ষ্যচ্যুতি ও স্থিতিশীল তেহরান
অভিযান শুরুর আগে ধারণা করা হয়েছিল, প্রচণ্ড সামরিক চাপে ইরানে ব্যাপক জনরোষ সৃষ্টি হবে এবং সরকারের পতন ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, চার দিন পরেও ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনকাঠামো বেশ স্থিতিশীল। উল্টো দেশটি এখন ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পরও তেহরান আলোচনার কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না, বরং তাদের সামরিক ইউনিটগুলো সমন্বিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

ওয়াশিংটনের সুর বদল
পেন্টাগন এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে আসা সাম্প্রতিক বার্তাগুলোতে কৌশলী পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন স্বীকার করেছেন যে, এই যুদ্ধ স্বল্পস্থায়ী না-ও হতে পারে এবং এতে 'অতিরিক্ত প্রাণহানি'র আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ 'শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন'-এর পরিকল্পনা অস্বীকার করলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান লক্ষ্য এখন ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণ নির্মূল করা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, 'শক অ্যান্ড অউ' (আকস্মিক প্রচণ্ড আঘাত) কৌশল কাজে না আসায় যুক্তরাষ্ট্র এখন দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইরানের নতুন রণকৌশল: 'ব্যয় চাপিয়ে দেওয়া'
ইরান কেবল আত্মরক্ষা নয়, বরং আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করেছে। তেহরানের কৌশল হলো পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া।

জ্বালানি সংকট: হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা এবং সৌদি ও কাতারের তেল-গ্যাস শোধনাগার বন্ধ হওয়ার উপক্রমে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।

আঞ্চলিক অস্থিরতা: বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে করে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে পড়েছে।

অভ্যন্তরীণ বিবাদ ও প্রক্সি যুদ্ধের শঙ্কা
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে জনরোষ তৈরির আহ্বান জানালেও তা সফল হয়নি। এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ভেতরে কুর্দি ও অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহারের কথা ভাবছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে কুর্দি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে ইরান একে 'দিবাস্বপ্ন' আখ্যা দিয়ে ইরাক সীমান্তের কুর্দি ক্যাম্পগুলোতে প্রতিরোধমূলক হামলা চালিয়েছে।

উপসংহার
বর্তমান পরিস্থিতি নির্দেশ করছে যে, এই যুদ্ধ কেবল সামরিক শক্তির লড়াই নয়, বরং এটি একটি সহ্যক্ষমতার পরীক্ষা। ইরানের লক্ষ্য হলো বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা এবং মার্কিন মিত্রজোটের ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করা, যাতে ওয়াশিংটন পিছু হটতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে তা এশিয়ায় চীনের বিরুদ্ধে তাদের বৃহত্তর কৌশলগত অবস্থানকেও দুর্বল করে তুলতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট এখন কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থায়িত্বের জন্য এক বিশাল হুমকিতে পরিণত হয়েছে।