২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

সরকারি চা-বাগানে ‘ভুতুড়ে’ শ্রমিকের মেলা: বেতন-রেশনে বছরে লোপাট ১২ কোটি টাকা

সরকারি চা-বাগানে ‘ভুতুড়ে’ শ্রমিকের মেলা: বেতন-রেশনে বছরে লোপাট ১২ কোটি টাকা

সরকারি খাতায় নাম আছে, নিয়মিত হাজিরা পড়ছে, এমনকি রেশন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাও উঠছে নিয়মিত। কিন্তু বাস্তবে সেই শ্রমিকের কোনো অস্তিত্ব নেই। কেউ মারা গেছেন বহু বছর আগে, কেউবা অবসরে গেছেন। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সরকারি নিউ সমনবাগ চা-বাগানে এভাবেই বছরের পর বছর ধরে ‘ভুতুড়ে’ শ্রমিকের নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের সাম্প্রতিক এক তদন্ত প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, ১ হাজার ৮২০ জন শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ৩১৫ জনের তথ্য সঠিক। বাকি প্রায় সব তথ্যেই রয়েছে বড় ধরনের অসংগতি।

মৃত ও অস্তিত্বহীন শ্রমিকের নামে বেতন
তদন্ত দল সরজমিনে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছে, দ্বীপনারায়ণ, শচীন, সুজন ও কবিতা নামের চার শ্রমিক কয়েক বছর আগেই মারা গেছেন। কিন্তু বাগানের নথিপত্রে তাঁরা এখনো ‘সক্রিয়’। এমন অন্তত ৪০ জন মৃত, অবসরপ্রাপ্ত ও অস্তিত্বহীন শ্রমিকের সন্ধান পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এছাড়া আরও ১৭০ জন শ্রমিক ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে নিয়মিত বেতন-ভাতা ও রেশন তুলছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ১,১৬০ জন শ্রমিকের নিয়োগপত্রের সাথে জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) কোনো মিল নেই। এছাড়া ৮০ জন শ্রমিকের বয়স ৬০ বছরের বেশি হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের অবসরে না পাঠিয়ে শ্রমিকের তালিকায় রাখা হয়েছে।

তদন্ত দলের ওপর হামলা ও অবরুদ্ধ
চলতি বছরের জানুয়ারিতে চা বোর্ডের ৬ সদস্যের একটি দল ৯ দিনব্যাপী এই অনুসন্ধান চালায়। তদন্ত শেষে ফেরার পথে ‘ভুয়া’ শ্রমিকেরা সংঘবদ্ধ হয়ে তদন্ত দলের ওপর হামলা চালায় এবং তাঁদের প্রায় দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। তদন্ত দলের সদস্য মো. রাজিবুল হাসান বলেন, "আমরা চেয়েছি প্রকৃত শ্রমিকেরা সুবিধা পাক। কিন্তু একটি চক্র ভুতুড়ে শ্রমিক সাজিয়ে সরকারের প্রতি মাসে প্রায় ১ কোটি টাকা অপচয় করছে।"

লোকসানের বৃত্তে সরকারি বাগান
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভুয়া শ্রমিকদের পেছনে প্রতি বছর সরকারের ক্ষতি হচ্ছে ১২ কোটি টাকা। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ও আর্থিক সক্ষমতায়।

উৎপাদন বৈষম্য: ২,০৯৬ একরের বিশাল এই বাগানে ১,৮২০ জন শ্রমিক কাজ করলেও ২০২৪ সালে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৭.৯২ লাখ কেজি চা। বিপরীতে, হবিগঞ্জের একটি বেসরকারি বাগান অর্ধেকের কম জমি ও এক-তৃতীয়াংশ শ্রমিক নিয়ে এর চেয়ে বেশি চা উৎপাদন করেছে।

আমানত ভাঙার হিড়িক: আয় না থাকায় গত ৮ বছরে চা বোর্ডের স্থায়ী আমানত ভেঙে ৩৩ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে শ্রমিকদের বেতন দিতে। অথচ গত ১০ বছরে নতুন চারা লাগানোর জন্য ১৭ কোটি টাকা দিলেও বাগানের ৩০ শতাংশ জমি এখনো ফাঁকা পড়ে আছে।

অব্যবস্থাপনার দায় ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
বাগানের ব্যবস্থাপক শহিদ নেওয়াজ জানান, চায়ের মান খারাপ হওয়ার পেছনে দীর্ঘসময় লোডশেডিং এবং শ্রমিক সংগঠনের অসহযোগিতা বড় কারণ। অন্যদিকে, চা বোর্ডের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এক চিঠিতে বাগানগুলোকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে আমানত ভেঙে আর কোনো ঋণ দেওয়া সম্ভব হবে না।

তবে ন্যাশনাল টি কোম্পানির বর্তমান চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ কিছুটা আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি জানান, গ্রিন টি ও হোয়াইট টি-র মতো উচ্চমূল্যের চা উৎপাদনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজার ধরার পরিকল্পনা করা হচ্ছে এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার জন্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

পেশাদারিত্বের অভাব, রাজনৈতিক নিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির এই জাল ছিঁড়তে না পারলে দেশের সবচেয়ে বড় এই সরকারি চা-বাগানটি অচিরেই দেউলিয়া হওয়ার পথে ধাবিত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।