২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

পদ্মার চরে শিক্ষার হাহাকার: স্কুল পুড়িয়ে দখল করেছে মহিষের বাথান, অন্ধকারে হাজারো শিশু

পদ্মার চরে শিক্ষার হাহাকার: স্কুল পুড়িয়ে দখল করেছে মহিষের বাথান, অন্ধকারে হাজারো শিশু

সাত বছর বয়সী সাবিনা ইয়াসমিনের চোখেমুখে এখন বইখাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার তাড়না থাকার কথা ছিল। কিন্তু নাটোরের লালপুরের পদ্মার চরের এই শিশুটির দিন কাটে ধুলাবালি আর মায়ের কাজে সাহায্য করে। তার কাছে স্কুলের নাম নেওয়াটাই যেন এক দুঃসাধ্য বিলাসিতা। সাবিনা একাই নয়, লালপুরের পদ্মার ১৭টি দুর্গম চরের হাজারো শিশুর গল্পটা একই—শিক্ষা এখানে এক অপূর্ণ স্বপ্ন।

এক শ্রমিকের স্বপ্ন ও তার চিতা
চরের শিশুদের এই অন্ধকার দূর করতে এগিয়ে এসেছিলেন ঝন্টু প্রামাণিক নামে এক ইটভাটা শ্রমিক। নিজের হাড়ভাঙা খাটুনির জমানো টাকায় ২০২৫ সালের মার্চে রসূলপুর চরের আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে বাঁশ, কাঠ আর টিন দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটি স্বপ্নের পাঠশালা। কিন্তু সেই স্বপ্ন স্থায়ী হয়েছিল মাত্র তিন সপ্তাহ। রাতের আঁধারে কে বা কারা পুড়িয়ে দেয় স্কুলটি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যেখানে স্কুলটি ছিল, সেখানে এখন কেবল ছাই আর ধ্বংসাবশেষ। একমাত্র চিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে অক্ষত এক শহীদ মিনার। সেই শহীদ মিনারে হাত রেখে উদ্যোক্তা ঝন্টু প্রামাণিক আক্ষেপ করে বলেন, “ছেলেপিলের কষ্ট দেখে না খেয়ে স্কুলটা করছিলাম। মানুষ শত্রুতা করে ওটা পুড়িয়ে দিল। এখন নিজের জান বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।”

শিক্ষার জায়গায় মহিষের বাথান
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী গেরেস্তরা তাদের কোটি টাকার মহিষের বাথান টিকিয়ে রাখতে এবং আশ্রয়ণ প্রকল্পের জায়গা কবজা করতে স্কুলটি পুড়িয়ে দিয়েছে। পোড়া ভিটায় এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মহিষের পাল। বাথান মালিকদের একজন আরিফুল ইসলাম আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, “এখানে যারা আছে তাদের সবার উপরে বাড়ি আছে, এরা দখল করার জন্য স্কুল-রাস্তার কথা বলছে।” প্রাণের ভয়ে চরের সাধারণ মানুষ ক্যামেরার সামনে নাম বলতে সাহস না পেলেও সবার দাবি একটাই—তারা তাদের সন্তানদের ‘কামলা’ নয়, শিক্ষিত হিসেবে দেখতে চান।

ভৌগোলিক প্রতিকূলতা ও ঝরে পড়া শিশু
পদ্মার রসূলপুর, বিলমাড়িয়া, চরজাজিরাসহ ১৭টি চরের প্রায় ৮০০ পরিবারে এক হাজারের বেশি শিশু রয়েছে। নিকটস্থ সরকারি স্কুলটি ৫-৬ কিলোমিটার দূরে। বর্ষায় একমাত্র ভরসা নৌকা, আর শুকনো মৌসুমে মাইলের পর মাইল তপ্ত বালুচর। এত পথ পাড়ি দিয়ে ছোট শিশুদের পক্ষে স্কুলে যাওয়া অসম্ভব। স্থানীয় নারী সানজিদা ও জেসমিন জানান, কাজ ফেলে সন্তানদের এত দূরে নিয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে শিশুরা বড় হচ্ছে অশিক্ষিত হয়ে, জড়িয়ে পড়ছে নানা নেতিবাচক অভ্যাসে।

প্রশাসনের আশ্বাস ও বাস্তবতা
স্কুল পোড়ানোর বিষয়ে লালপুর থানার ওসি মো. মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ না পেলে তাদের তদন্ত করার সুযোগ নেই। তবে বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিদ্দিক আলী মিস্টু বিগত সরকারের অবহেলার কথা উল্লেখ করে দ্রুত একটি পাঠদান কেন্দ্র তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জুলহাস হাসান সৌরভ বলেন, “আমি নিজে চরগুলো পরিদর্শন করব। শিশুদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব।”