আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতির উদ্দেশে বিশেষ নির্বাচনী ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সোমবার রাতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সম্প্রচারিত এই ভাষণে তিনি একটি স্বনির্ভর, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে দলের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও নির্বাচনী ইশতেহারের মূল দিকগুলো দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।
তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন, “এবারের নির্বাচনের লক্ষ্য শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, এবারের নির্বাচন রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্বাচন।”
তরুণ ও বেকারদের জন্য ১ কোটি কর্মসংস্থান
২০ কোটি মানুষের এই জনবহুল দেশে বেকারত্ব দূরীকরণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে বিএনপি। তারেক রহমান ঘোষণা করেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে পর্যায়ক্রমে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। বিশেষ করে জেন-জি বা বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের জন্য কারিগরি ও ভাষা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে তাদের বৈশ্বিক বাজারের উপযোগী করে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
ফ্যামিলি কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষা
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিএনপি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রথার ঘোষণা দিয়েছে। তারেক রহমান জানান:
প্রায় ৪ কোটি প্রান্তিক পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হবে।
কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা বা সমমূল্যের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে।
কৃষকদের জন্য থাকবে ‘ফার্মার্স কার্ড’ এবং প্রবাসীদের হয়রানি বন্ধে ‘প্রবাসী কার্ড’।
নারী শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের নতুন দিগন্ত
নারীদের ক্ষমতায়নে খালেদা জিয়ার শাসনামলের ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, স্নাতক পর্যন্ত নারী শিক্ষা বিনা বেতনে অব্যাহত থাকবে। স্বাস্থ্যসেবায় ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’ নীতিতে ১ লক্ষ ‘হেলথ কেয়ারার’ নিয়োগ দেওয়া হবে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী। তারা প্রতিটি ইউনিয়নে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দেবেন।
দুর্নীতি দমন ও অর্থ পাচার রোধ
গত ১৫ বছরে দেশ থেকে প্রতি বছর পাচার হওয়া প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার রোধ করার কঠোর অঙ্গীকার করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, পাচার হওয়া এই অর্থ রোধ করতে পারলে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত সহজ হবে। এছাড়া প্রশাসনে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার বদলে মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’
ধর্মীয় সহাবস্থান নিশ্চিত করতে তারেক রহমান বলেন, সংবিধানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাটি পুনরায় সন্নিবেশিত করা হবে। তবে তিনি পরিষ্কার করেন, “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।” হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি ইমাম, মোয়াজ্জিন ও অন্য ধর্মগুরুদের জন্য রাষ্ট্রীয় আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
গণতন্ত্রের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা
ভাষণের শুরুতে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ১৪ শতাধিক মানুষ এবং গত দেড় দশকের গুম-খুন হওয়া ব্যক্তিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি ‘আয়নাঘর’কে জ্যান্ত মানুষের কবরস্থান হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই বিশাল আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না।
সবশেষে ভোটারদের প্রতি আবেগঘন আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন,
“১২ ফেব্রুয়ারি আপনারা ধানের শীষের প্রার্থীদের দায়িত্ব নিন, ১৩ তারিখ থেকে আপনাদের নির্বাচিত এমপিরা আপনাদের দায়িত্ব নেবেন। তারুণ্যের প্রথম ভোট ধানের শীষের জন্য হোক।”