দীর্ঘ ১৫ বছরের একচ্ছত্র শাসনের অবসান এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ।
আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং বিরোধী দলগুলোর সরব উপস্থিতি গত তিনটি নির্বাচনের চিত্রকে আমূল বদলে দিয়েছে।
ভোটের মাঠে নতুন মেরুকরণ
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দীর্ঘ সময় পর একটি উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। লড়াইয়ের মূল কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোট। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টিতেই লড়ছে বিএনপি। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জয়ের ব্যাপারে পূর্ণ আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীও তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে মাঠে রয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশ নিয়ে গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে।
প্রধান চ্যালেঞ্জ: দুর্নীতি ও অর্থনীতি
নির্বাচনী জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের কাছে এবারের নির্বাচনে প্রধান মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্নীতি এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। সাড়ে ১৭ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে বিগত মাসগুলোর অস্থিরতা কাটিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই হবে নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
নির্ধারক হয়ে উঠবে ‘জেন-জি’ ভোটার
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচনের ভাগ্য বদলে দিতে পারে তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’ ভোটাররা। মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশই তরুণ। ২১ বছর বয়সী প্রথমবার ভোটার হওয়া মোহাম্মদ রাকিবের মতে,
“আগের সময়গুলোতে মানুষের কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না। আমরা এমন সরকার চাই যারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।”
ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েন
বাংলাদেশের এই নির্বাচন কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও চীনের প্রভাব বলয় নির্ধারণেও বড় ভূমিকা রাখবে। শেখ হাসিনার বিদায়ের পর নয়াদিল্লির প্রভাব কিছুটা ম্লান হলেও বেইজিং তাদের অবস্থান পোক্ত করেছে। বিশ্লেষক পারভেজ করিম আব্বাসীর মতে, ভারতের জন্য জামায়াতের চেয়ে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন বেশি কৌশলগত হতে পারে। অন্যদিকে, জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে পাকিস্তানের সঙ্গে সখ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও দলটি জানিয়েছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে না ঝুঁকে নিজস্ব মূল্যবোধে রাষ্ট্র চালাতে চায়।
এক নজরে নির্বাচনী চিত্র:
মোট ভোটার: ১২ কোটি ৮০ লাখ।
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী: বিএনপি, জামায়াত-এনসিপি জোট এবং অসংখ্য স্বতন্ত্র প্রার্থী।
মূল প্রতীক: ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা।
নির্ধারক ভোটার: তরুণ প্রজন্ম (জেন-জি)।
দেশজুড়ে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। দেয়ালে দেয়ালে সাদা-কালো পোস্টার আর রাজপথে প্রার্থীদের প্রচারণায় মুখর চারপাশ—যা গত দেড় দশকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ছিল অনেকটা অচেনা এক দৃশ্য।