শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগ ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল সংলগ্ন এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল ব্যবহার করেছে। এই ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিবসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাতেই একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
আজ শুক্রবার বিকেলে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে এগোতে চাইলে পুলিশ লাঠিপেটা ও জলকামান ব্যবহার করে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এ সময় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় শাহবাগ ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় এলাকা। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে দ্বিতীয় দফায় আবারও সংঘর্ষ শুরু হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের পূর্ণাঙ্গ বিবৃতি
সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। পাঠকদের জন্য তা হুবহু নিচে তুলে ধরা হলো:
"শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিকেল থেকে ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়। যমুনা ও এর আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভ নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথমে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বলপ্রয়োগ করেনি।
আজ শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে যমুনার অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে এবং একপর্যায়ে জলকামানের ওপর উঠে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। সরকার স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ধরনের গুলি ছোড়েনি।
জনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ও সংলগ্ন এলাকায় যেকোনো প্রকার সভা-সমাবেশ, মিছিল, গণজমায়েত ও বিক্ষোভ প্রদর্শন নিষিদ্ধ রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে পুলিশ সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক ও আইনানুগভাবে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। এ সময় কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র (lethal weapon) ব্যবহার করা হয়নি বলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় আহত হয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবেরসহ সর্বমোট ২৩ জন চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। তবে তাঁদের কারও শরীরে গুলির আঘাত নেই বলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেছেন।
সরকার স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করছে যে শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারে সরকার বদ্ধপরিকর। জাতিসংঘের অধীনে তদন্ত পরিচালনার আইনগত দিক সরকার গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে এবং এ বিষয়ে আগামী রোববার, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হবে।
বিভিন্ন মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তা সঠিক নয়।
আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে এই সংবেদনশীল রাজনৈতিক সময়ে সরকার সবাইকে ধৈর্য, সংযম ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছে। দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষ অধীর আগ্রহে এই নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি বর্তমানে বাংলাদেশের দিকে নিবদ্ধ। বিদেশি বহু সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক ইতিমধ্যে বাংলাদেশে উপস্থিত হয়েছেন।
সরকার দেশের সব নাগরিকের প্রতি একটি উৎসবমুখর, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা ও সহযোগিতার আহ্বান জানাচ্ছে। আসন্ন নির্বাচন রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও রক্তক্ষয়ের বিনিময়ে অর্জিত এই নির্বাচনী সুযোগ জাতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
দেশের সার্বিক অগ্রগতি, স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এই নির্বাচনকে অবশ্যই সুষ্ঠু, সুন্দর, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে কোনো ধরনের বিচ্যুতি গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার বিশ্বাস করে, দেশের সব নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্বশীল আচরণ ও সহযোগিতার মাধ্যমেই একটি গ্রহণযোগ্য, মর্যাদাপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।"
হতাহতের চিত্র
ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে অর্ধশতাধিক আহতের দাবি করা হলেও সরকারি ভাষ্যমতে ঢামেক হাসপাতালে ২৩ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান নিশ্চিত করেছেন যে, আহতদের শরীরে কোনো গুলির চিহ্ন নেই; আঘাতগুলো মূলত ধস্তাধস্তি ও ইটের আঘাতজনিত।
বর্তমানে শাহবাগ ও সংলগ্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পরিস্থিতি থমথমে থাকলেও রাত ৯টার পর নতুন করে কোনো সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি।